মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৩

মে দিবস পালন এখন ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে


মে দিবস পালন এখন ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে

 নুরুল্লাহ মাসুম

ইতিহাসের যে বাঁকে আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষেরা মে দিবসের আলোকবর্তিকা জ্বেলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্ব তেমনি এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’  স্লোগান দেয়ার দিন পহেলা মে। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের এক ঐতিহাসিক গৌরবময় দিন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হলেও ‘মে দিবস’ নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছে দিনটি। এদিন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। মে দিবস শ্রমিকদের একটি বড় বিজয়। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকেরা বিজয়ের ইতিহাস রচনা করেছে। দিন বদল হয়েছে, উন্নত প্রযুক্তির আশীর্বাদে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তবে দিন বদলের ছোঁয়া লাগেনি শ্রমিকদের জীবনে। ফলে দেখা যায় আবারও বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের মত আমাদের দেশেও মে দিবস পালন করাটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। মালিকপক্ষ অবশ্য বলতে পারেন, শ্রমিকরা এ দিনটিতে ছুটিতো পাচ্ছে। হ্যা, সরকার দিনটিকে সরকারী ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ দিনটিতে রাষ্ট্রপতি, সরকার প্রধান ও সংসদের বিরোধী দলের প্রধানও বাণী দিয়ে থাকেন। শ্রম মন্ত্রণালয় আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুর শ্রমিক সংগঠনগুলো  বর্নাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে থাকে। শ্রমিকরা (অবশ্যই কিছু সংখ্যক) নেচে-গেয়ে কিছু সময় আনন্দ করে। সহযোগী সংগঠন বা অঙ্গ সংগঠন যে নামেই হোক, কিছু শ্রমিক সংগঠন থাকলেও সেগুলো প্রকৃত শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করে কি না তা শ্রমিকরাই বাল জানেন। এ দনিটিতে প্রচার মাধ্যমগুলোর আয়োজনও থাকে চোখে পড়ার মত।  তবে প্রকৃতার্থে মে দিবসের আর্জন কতখানি, শ্রমিকরা তা অনুধাবন করতে পারছে, বিশেষত পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা সব চেয়ে বেশী বুঝতে পারছে। মে দিবস তাদের কষ্ট বাড়িয়েছে বই কমায় নি। না জেনে গাধার মত খাটতে যতটা না কষ্ট, সুযোগের কথা জেনে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট অনেক বেশী। সে কথা লিখে কি আর বোঝানো যাবে?
শ্রমিকের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল অবিভক্ত বঙ্গে। ১৮৬২ সালের মে মাসে অর্থাৎ শিকাগোর ঘটনার ২৪ বছর আগে। ঐ ধর্মঘট ডেকেছিলেন রেলওয়ে শ্রমিকরা। রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের শ্রমিকদের মধ্যে কর্মঘন্টা বিভাজন ছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। হাওড়া স্টেশনের সহস্রাধিক রেল শ্রমিক দশ ঘন্টার বদলে আটঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট করেছিল। ঐ ধর্মঘটের সংবাদ ছাপা হয়েছিল ৫ মে, ১৮৫২, বাংলা ২৩ বৈশাখ ১২৬৯ সনে প্রকাশিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সোম প্রকাশ’ পত্রিকায়। ‘বিবিধ সংবাদ’ শিরোণামে পত্রিকাটির ৩০৫ পৃষ্ঠায় ধর্মঘটের খবর ছাপা হয়। ঐ সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘সম্প্রতি হাবড়ার রেইলওয়ে স্টেশনে প্রায় ১২০০ মজুর কর্মত্যাগ করিয়াছে। তাহারা বলে লোকোমোটিব (গাড়ি) ডিপার্টমেন্টের মজুরেরা প্রত্যহ আটঘন্টা কাজ করে। কিন্তু তাহাদিগকে দশঘন্টা পরিশ্রম করিতে হয়। কয়েক দিবসাবধি কার্য্য স্থগিত রহিয়াছে। রেইলওয়ে কোম্পানি মজুরদিগের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করুন; নচেৎ লোক পাইবেন না।’ ঐ ধর্মঘট এখনো বিশ্বের প্রথম সংগঠিত ধর্মঘট হিসেবে চিহ্নিত। সেই  পথ ধরেই বুঝি ইউরোপ, আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণী অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এগিয়ে গিয়েছিল। এ যেন ‘আজ বাংলা যা ভাবে, কাল বিশ্ব তা ভাবে’। অবশ্য রেল ধর্মঘটের আগে এদেশেই ১৮২৩ সনে পালকির বেহারারা কর্মবিরতি পালন করেছিল; যা নাড়া দিয়েছিল ইংরেজ শাসককে। ধর্মঘট আরো একটি হয়েছিল ১৮৩৫ সালে। নদী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মালবাহকরা ধর্মঘট করেছিল। এর প্রভাব পরেছিল পণ্যের মূল্যে সে আমলে। তবে ঐ দু’টি ধর্মঘট কোন সংগঠিত ধর্মঘট ছিল না। সংগঠিত ক্ষেত্রের আধুনিক শিল্প শ্রমিকদের কাজের ঘন্টা কমানোর দাবিতে আন্দোলনের প্রথম নথিভূক্ত ঘটনা এই রেল শ্রমিক ধর্মঘট।
বাংলার রেল ধর্মঘটের ৪ বছর পর ১৮৬৬ সালে বাল্টিমোড়ে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা একজোট হয়ে কাজের দিন ৮ ঘন্টায় নামিয়ে আনার দাবিতে প্রভাাব নেয়। তারপর দাবি আদায়ে শুর“ হয় আন্দোলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন বিকশিত হচ্ছে ফোর্ড-রকফেলারদের সাম্রাজ্য। এর পরের ইতিহাস সকলের জানা।
পয়লা মে, ১৮৮৬। শনিবার। স্বাভাবিক কাজের দিন। শ্রমিকরা কারখানায় যাবার পরিবর্তে নেমে আসে রাজপথে, কারখানার চাকা বন্ধ। শ্রমিকরা চলছে মিশিগান এভিনিউর মিছিলে যোগ দিতে। ‘আট ঘন্টা জুতো পায়ে’ দিয়ে, ‘আট ঘন্টা চুরুট’ মুখে তাদের। মিছিল গিয়ে শেষ হলো লেকফ্রন্টে। দাবি আদায়ের কথা উঠে এলো ভাষণে। সুনসান সমাবেশ। কোথাও কোন গোলমাল নেই। যে যার বাড়ি ফিরে গেল, পরদিন রোববার ছুটির দিন। সোমবারও চলে ধর্মঘট। ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার ওয়ার্কসের শ্রমিকরা ধর্মঘট ভাঙতে আসা ঠ্যাঙারদের মোকাবেলা করতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। ছয়জন শ্রমিক নিহত হয় ঘটনাস্থলেই। পরদিন প্রতিবাদ সভা হে মার্কেট স্কয়ারে। আকষ্মিকভাবে পুলিশ এসে সমাবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। সমাবেশের ভীড়ে তখন আত্মগোপনকারী অন্তর্ঘাতকরা, ছুঁড়ে দিল বোমা। প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারদিক। একদিকে বোমায় আহত মানুষ, অন্যদিকে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে সমাবেশে উপস্থিত শ্রমিকদের উপর।
১২৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালে শ্রমজীবি মানুষ সেদিন স্পষ্ট করেছিল, অত্যাচার করে কখনো কাউকেই খুব বেশিদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পাবার অধিকার সব শ্রমিকই রাখে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা পরিশোধ করার কথাতো সেই চৌদ্দশ বছর আগেই বলা হয়েছে। তারপরও কি বলা যাবে পূরণ হয়েছে সে সব? কিংবা ভাগ্যের হেরফের ঘটেছে তেমন? তবে কি এক নিগড় থেকে আরেক নিগড়ে পৌঁছা? এটাতো সত্যিই ক্রীতদাসের জীবন থেকে বেরিয়ে আসা; রক্ত ঢেলে দিয়ে শ্রমজীবির শ্রমের কর্ম সময় আটঘন্টা নির্ধারণ করতে পারা, সে এক যুগাš—কারী ঘটনা অবশ্যই। আর এই যে অর্জন, তা অনুপ্রাণিত করেছে বৈকি, বিশ্বের শ্রমজীবি মানুষকে যার যার পরিধিতে।
১২৬ বছর আগের সেদিনে যে অধিকার অর্জিত হয়েছিল; যে সংহতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, সময়ের পরম্পরায় নানা আবর্তন-বিবর্তনে বিষয়গুলো স্বস্থানে থাকেনি। সচেতনভাবে সংহতির চেতনায় উদীপ্ত হয় ক’জন শ্রমিক আর? শিল্প শ্রমিকদের রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার। সেসব নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। ইতিহাসের যে বাঁকে আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষেরা মে দিনের আলোকবর্তিকা জ্বেলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্ব তেমনি এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, যাদের প্রতিদিনের উপার্জনে প্রতিদিন চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ মজুরি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নির্ধারিত দারিদ্র্য সীমার নিচে। ইতিমধ্যে সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। এসকল পদক্ষেপের সুফল ৫ কোটি মজুরি শ্রমিকের কাছে পৌঁছবে কীভাবে, তা ভাবতে হবে? যেখানে সরকারের নির্ধারিত মজুরিই একজন মানুষকে বাধ্য করছে দাারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতে। অধিকাংশ শিল্পখাতে শ্রমিকের জন্য মজুরির কোনো নির্ধারিত মাশ্রন্ডই নেই, সেখানে শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করবে? কীভাবে গার্মেন্টস শ্রমিক তার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাবে? ৫ কোটি পরিবারকে দরিদ্র্যসীমার নিচে রেখে দারিদ্র্য বিমোচনে কতোখানি সাফল্যের মুখ দেখবে? এ প্রশ্নগুলো আজ ভাবতে হবে। তাই মজুরির প্রশ্ন আজ কেবল শ্রমিক বা তার পরিবারের কোনো স্বতন্ত্র বিষয় নয়। এর আন্ত:সম্পর্ক অনেক ব্যাপক ও গভীর। একে শুধু শ্রমিকের সঙ্গে বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখলে চলবে না। একে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে।
ন্যায্য মজুরি না পেলে বা মজুরিই আদৌ না পেলে, ছুটি না পেলে, কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হলে এদের নালিশ করার কোনো জায়গা নেই। অনেক ক্ষেত্রে আইন তাদের নালিশ করার অধিকার দেয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ নেই যেখানে এ অসহায় শ্রমিক যেতে পারে। আশ্চর্য হলেও সত্য, একজন নারী শ্রমিক স্ত্রী হিসেবে স্বমীর বিরুদ্ধে দেনমোহর না দেওয়া বা নির্যাতনের জন্য মামলা করতে পারে। সেই নারী শ্রমিককে তার মালিক যদি কাজ করিয়ে মজুরি না দেয় বা ঠিক সময় মজুরি পরিশোধ না করে অথবা কাজ করতে গিয়ে কারখানার অব্যবস্থাপনার জন্য সে আহত হয় তাহলে ঐ নারী শ্রমিকের নালিশ জানাবার কোনো জায়গা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত কিছু সংখ্যক শ্রমিক ব্যতীত দেশের কোটি কোটি নারী ও পুরুষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে আজ এ কথা প্রযোজ্য।
মে দিবস পালন যাতে ফ্যাশন থেকে সত্যিকার অর্থে শ্রমিকের দাবী আদায়ের দিনে পরিণত হয়, শ্রমিক যেন ন্যায্য মজুরী পায়, সরকার ঘোষিত ছুটি পায়, নারী শ্যমিকরা যাতে তাদের পাওনা ঠিকমত পেতে পারে; সে সব দিকে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একটু নজর দিলে বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক পেতে পারে সত্যিকারের মে দিবসের ফসল।

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৩

শবের মিছিল আর কত দীর্ঘ হলে আমরা মানুষ হবো?: এত মৃত্যুর দায়ভার কে নেবে

শবের মিছিল আর কত দীর্ঘ হলে আমরা মানুষ হবো?

এত মৃত্যুর দায়ভার কে নেবে

নুরুল্লাহ মাসুম

আবারো লাশের মিছিল! এক, দুই, তিন নয় শত শত। লাশের প্রাথমিক আবাস হয় এনাম মেডিকেলের লাশ ঘরে, তারপরে হাসপাতালের ওয়ার্ডে, তারও পরে বরান্দায়- সবশেষে গ্যারেজে। না, তাতেও কুলোয়নি। হাসপাতালের গন্ডি ছাড়িয়ে লাশদের জায়গা হয় পার্শবর্তী অধরচন্দ্র বিদ্যালয়ের বারান্দায়। সব জায়গাতেই লাশের উত্তরাধিকারদরে আহাজারি, আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়; চোখে জল আসে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী সেনা সদস্যদেরও- তারাওতো মানুষ। দমকল বাহিনীর সদস্যরা হামেসাই এমন দৃশ্য দেখে তাকে, বরা যায় লাশ আর ধ্বংসস্তুপের মাঝেই তাদের বসবাস।
একবার মনে হচ্ছিল, প্রয়াত অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে যেভাবে লাশের আগমন ঘটে, সেই বর্ণনার সাথে তুল্যমান হতে পারে; ভেবে দেখলাম মুনীর চৌধুরী হয়তো ভাবতেও পারতেন না, এভাবে লাশের মিছিল হতে পারে। তাঁর ভাবনার একটা গন্ডি ছিল- দুই, চার, ছয়....। বাস্তবে বুধবার দেশবাসী যা দেখলো তা মুনীর চৌধুরীর সেই ভাবনা ছাপিয়ে, এমনকি স্মৃতিতে এখনো উজ্জল আশুলিয়ার তাজরিন গার্মন্টেসের লাশের মিছিলকেও ছাড়িয়ে গেল এবারে। এ নিবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আটটা পর্যন্ত সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের কারণে মৃতের সংখ্যা ২৩০ জন। ভবনে আটকে থাকা দুই হাজার জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকার অদূরে সাভারে রানা প্লাজা নামের আট তলা ঐ ভবনের তৃতীয় তলার নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ তলার প্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড, পঞ্চম তলার প্যান্টম ট্যাক লিমিটেড ও ষষ্ঠ তলার ঈথার টেক্সটাইল লিমিটেডে পাঁচ থেকে ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করতো বলে জানা গেছে। নীচের তলা গুলোয় ব্যাংক ও মার্কেট ছিল। হরতাল তাকায় মার্কেট ছিল বন্ধ, না হলে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তো। ভবনটিতে আগেই ফাটল দেখা দেয়ায় ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকৌশলীদের নিষেধাজ্ঞা সত্তে¡ও ভবন মালিকের আশ্বাসে গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খোলা রাখে। ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর থেকে উদ্ধার পাওয়া আহত কর্মীরা জানিয়েছেন প্রকাশ্যে- কারখানার মালিকপক্ষের লোকজন জোর করে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করে। শ্রমিকরাও জানতো ভবণে ফাটল ধরার কথা। কারখানা মালিকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন ভবনের মালিক, স্থানীয় যুবলীগ নেতা। ফাটল আসলে ভবনে নয়, পলেস্তায়- এমন কথা তিনি বেসরকারী টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই বলেছেন।
খবরে প্রকাশ, ভবন মালিকও দুর্ঘটনার সময় ভবনের নীচ তলাতে অবস্থান করছিলেন। এ সংক্রান্ত পত্রিকার খবর এমন- “বুধবার সাভারের বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বহুতল ভবন রানা প্লাজার মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা মো. সোহেল রানাও ভবনটি ধ্বসের সময় নিচতলা ছিলেন। জনতার রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি বের হতে না পেরে স্থানীয় সাংসদসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খবর দেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাংসদ তৌহিদ জং মুরাদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভবন মালিক রানাকে বের করে নিয়ে যান। ভবন ধ্বসে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটলেও সোহেল রানা আঘাত পাননি বলে জানান ঘটনাস্থলে রানার সঙ্গে থাকা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এডভোকেট মাসুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার বিকেলেই ভবনটিতে বড় ধরণের ফাটল দেখা দিলে ভবন মালিক সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ভবনের বড় ধরনের কোন তি হয়নি। সামান্য একটু প্লাস্টার খসে পড়েছে। এটা তেমন কিছু না। যদিও স্থানীয় প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক ভবন ঘুরে দেখে বলেছিলেন, ভবনের নিরাপত্তার স্বার্থে বুয়েট থেকে প্রকৌশলী এনে পরীক্ষা করা প্রয়োজন, তা না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নয় তলা ভবনটি ধসে পড়ে বহু মানুষ হতাহত হয়। ওই ভবনে চারটি তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করে। ধ্বসের সময় কারাখানায় কাজ চলছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।”
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বলছে, ভবনটি নির্মান করা হয়েছিল একটি পুকুর ভরাট করে। এমনও শোন গেছে ভবনটির নকশা অনুমোদন করেছে সাভার পৌরসভা। রাজউক বলছে তাদের অনুমতি না নিয়েই পৌরসভা ভবনটির নকশার অনুমোদন দিয়েছে। সংগত কারণে ধরে নেয়া যায়, অনুমোদন দেয়ার আগে পৌরসভার প্রকৌশলী সয়েল টেস্ট করেননি যথাযথভাবে। অথবা এমনও হতে পারে, রাজনৈতিক চাপের কারণে পৌরসভারও হয়তবা তেমন কিছু করার ছিলনা। কারণ যা হোক, ভবন মালিক এ দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। তেমনি সাভার পৌর কর্তৃপক্ষ এবং এমনকি রাজউকও এর দায়িত্ব এড়াতে পারে না। রাজধানীর এতকাছে, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা সাভার, সেখানে ভবন নির্মানে তাদের কোন দায়িত্ব নেই এমনাটাতে ভাবা যায় না। এমনও শোন যাচ্ছে, ভবন মালিক নাকি বলেছেন, একটা পিলার ফাটলে কিছু হয় না। প্রকৌশলীদের চেয়ে তিনি বেশী বুঝেছিলেন বলেই এমন দুর্ঘটনা।
শ্রমিকদের আপত্তির মুখেও তাদের জোর করে, কারো কারো ভাষ্যমতে পিটিয়ে কাজে যোগদানে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার জন্য কারখানার মালিকরাও দায়ী; তাদেরকে সকলের আগে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে হবে। ভবন মালিক ক্ষমতাসীন দলের বলেই নিয়ম ভেঙ্গে চাঁচ তরা ফাউন্ডেশনে আট তলা নির্মান করবেন, এটাও কি মেনে নেয়ো যায়? বিল্ডিং কোড না মানলে যে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমন উদাহরণ আমাদের সামনে অনেক রয়েছে। মালিকরা হয়ত বীমার টাকায় উদ্ধার পেয়ে যান, কিন্তু অভাগা এই শ্রমিকরা- তারা কি একরে পর এক জীবন দিয়েই যাবে? তারা কি ক্রমাগত সংবাদ মাধ্যমের লিড নিউজ হয়ে থাকবে?
যে কোন জরুরী প্রয়োজনে উদ্ধার কার্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন স্থানীয় জনসাধারণ। সাভারের এবারের ভয়াবহতম দুর্ঘটনায়ও তাই ঘটেছে। আশেপাশের সাধারণ মানুষ নিজ নিজ সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন উদ্ধার কাজ চালাতে। পরে যোগ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস, সেনা বাহিনী, নৌ বাহিনীসহ অন্যান্য সরকারী বিভাগ। দেশবাসী ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে দেখেছন, উদ্ধারকাজে ধীরগতি এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমš^হীনতার বিষয়টি। আমাদের দেশের সরকারী সংস্থায় যারা কাজ করেন তারা হয়তো অসাধারণ মানুষ, তাই সাভারে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যদের মতো তাদের চোখে হয়তো পানি আসে না। তাই অবস্থাটা এমন- ‘দেখি না কি হয়’।
দেশের যে কোন বিপদে সাধারণ মানুষ সবার আগে- এটা আবারো প্রমানিত হল। ইন্টারনেটে কয়েকটি পোস্টের মধ্যদিয়ে দ্রুত শুরু হয়ে যায় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের রক্ত সংগ্রহ অভিযান। জানা গেছ কেবল গণজাগরণ মঞ্চ থেকেই পাঁচ সস্রাধিক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়েছে বুধবার রাত আটটার মধ্যে। রক্ত সংগ্রহ করেছে বিরোধী দল বিএনপি- দলীয় কার্যালয়ের সামনে। রক্ত দিয়েছে স্কাউটরাও- রেড ক্রিসেনট সোসাইটিতে। দুর্ঘটনাস্থলেও স্কাউটরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণ মানুষের রক্ত দেবার এ মহৎ কাজে হাজার হাজার তরুণ অগ্রগামী, অন্তত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ চত্তরে মানুষের ভীরে তাই মনে হয়েছে।
বিরোধী দল দেরিতে হলেও হরতাল তুলে নিয়েছে, সে জন্য সংসদে দাড়িয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমার জানতে ইচ্ছে করে, দুর্ঘটনা ঘটলো সকালে- হরতাল প্রত্যাহারে বিরোধী দলের এত বিলম্ব হলো কেন? তারা কি পারতো না তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে অবিলম্বে হরতাল কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিতে? যদি তাই হতো, সাধারণ মানুষের আস্থা তাদের প্রতি বাড়তো বই কমতো না।
দুর্ঘটনার পরে ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই সেখানে গেছেন। গেছেন  বিরোধী দলের নেতাসহ অনেকে নেতা। অনেকের কথার মাঝে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথাটা প্রনিধান যোগ্য, যদিও তিনি কথাটা বলেছেন মুন্সীগঞ্জে গিয়ে- পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি এমনতরে:  “সাভার ট্র্যাজেডিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যায়িত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করার দাবি জানিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বৃহস্পতিবার সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনের আগে মাওয়া সার্কিট হাউসে সাংবাদিকেদের এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, সেখানে নিরীহ শ্রমিকদের জোর করে কাজে পাঠিয়ে তাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে, এটাকে আমি আরেক রকমের মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে মনে করি। বিষয়টা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার, নড়বড়ে একটা ভিত্তির ওপর নয়তলা বিল্ডিং করা হয়েছে। যারা অপরাধ করেছে তদন্ত কাজের নামে তাদের বিচারকে বিলম্বিত করার কোনো মানে হয় না। এ ধরণের তদন্তের ওপর দেশের মানুষের খুব একটা আস্থা এখন নেই। সাভারের ঘটনাকে তিনি সতর্কবার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হলে দেশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে।” সাভার ট্রাজেডি নিয়ে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এখানে উল্লেখ না করাই ভাল। তবে সাধারণ মানুষ বলছেন, যদি গুটি কয়েক পিকেটারের ধাক্কায় আটতলা ভবন ভেঙ্গে যায়, তবে সেই সব পিকেটারদরে জাতীয় সম্মাননা দেয়া হোক- কেননা, তারা জাতির গর্ব হতে পারে, তাদের দিয়ে অনেক শক্ত কাজ করানো যেতে পারে।
গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট পাঁচ কারখানার সদস্যপদ স্থগিত করেছে বলেও জানা গেল। মামলাও হয়েছে একাধিক। সরকারী নিয়মে তদন্ত কমিটিও হয়েছে; তবে কমিটির রিপোর্ট আদৌ কোনদিন প্রকাশ পাবে কি না, পেলেও দোষীরা রাজনৈতিক কারণে পার পেয়ে যাবে কি না, তা ভবিষ্যতই বলতে পারে।
আশুলিয়ার তাজরিন গার্মেন্টস দুর্ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই সাভারের এ ঘটনা, এতেও যদি দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের হুশ ফিরে না আসে, তবে বলতেই হবে একবিংশ শতকের অগ্রসরমান এ জগতে বসবাসের যোগ্য নই আমরা। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে অগ্রসরমান দুনিয়ার বাসিন্দা হতে হলে প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের নতুন নেতৃত্ব। ধুয়ে মুছে সাফ করতে হবে পুরাতনের ধ্যান ধারণা।
আমরা দেশবাসীর সাথে একমত হয়ে বলতে চাই, এ জাতীয় দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের প্রকৃতার্থে বিচার হতে হবে, দিতে হবে কঠোর শাস্তি, নইলে দেশে এ শবে মিছিল থামবে না, দিনে দিনে জাতীয় শোক দিবসের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে, যা আমরা আর দেখতে চাই না।


বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৩

আষাঢ়ের শুক্লপক্ষ


নুরুল্লাহ মাসুম


প্রায় ফাঁকা মানিক মিয়া অ্যাভিন্যুর পূর্ব প্রান্তে রিক্সা থেকে নামে সুজন। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে খামার বাড়ির পশ্চিম প্রান্তে বা খেজুর বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে অথবা সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে দাঁড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একশলা সিগারেট বের করে ঠোঁটে লাগায়। দেশলাই খুঁজতে গিয়ে ঝামেলা হয়। প্যান্টে গোটা চারেক পকেট থাকলেও কোথায়ও দেশলাই পেল না সে। বুক পকেটে হাত দিতে গিয়ে মনে মনে একচোট হেসে নেয়- গায়ে টি-শার্ট- পকেট থাকবে কি করে! বুঝলো, বেটা দেশলাই কখন হয়তো গলে বেরিয়ে গেছে পকেট থেকে- কোরবানীর এই দিনে সুজনের পকেটে নিঃস্পৃহ হয়ে থাকাটা ওর হয়ত ভাল লাগেনি।
অন্যান্য দিনের মত গলায় গামছা জাতীয় কিছু দিয়ে ঝুলিয়ে ছোকরা টাইপের সিগারেটওয়ালাদেরও দেখা মিলছে না। সুজন বোঝে- সিগারেট বিকিকিনিতে যে লাভ হবে তার থেকে কোরবানীর মাংস কালেকশনে লাভ ঢের বেশী। খানিকটা সময় কেটে গেলেও ওর মুখের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ হলো না। অগত্যা কিছুটা এগুতে হলো- অবশেষে মিললো।
সুজনের জীবনটাই এমনি করে কাটছে। সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায় ঠিক ‘পৌনে বারটা’ বাজার পরে।
জীবন্ত সুজনের মুখাগ্নি ঘটার পর আয়েশ করে টান দিয়ে পাঞ্জাবীদের মত লম্বা নাকের ততধিক সরু নাসিকা ছিদ্র দিয়ে গোয়ালন্দ থেকে খুলনাগামী স্টিমারের চিমনির মত ধোঁয়া ছেড়ে  স্বস্তি অনুভব করে সে; যদিবা এ চিমনির রঙ কালো নয়, শ্বেত-শুভ্র।
আনমনে হাটতে তাকে সুজন। সংসদ ভবনের উত্তর-পূর্ব কোনে এসে মন্ত্রীবাহী গাড়ীর বহরের হুইসেল শুনে মেজাজটা খিঁচ্ড়ে যায়। কোরবানীর ঈদে নয় কেবল; বছরে দু’টো ঈদের ছুটিতে ঢাকা যখন একেবারেই ফাঁকা হয়ে যায়, যখন ফাঁকা মহানগরীকে সত্যিকার বসবাসের উপযুক্ত মহানগরী বলে মনে হয়; তেমনি সময়ে ফাঁকা পথে মন্ত্রীবাহী গাড়ীর এই আর্তচিৎকার অসহনীয় লাগে। দাঁড়াতে হয় তাকে; ফুটপাথ ঘেঁষে। সামনে দিয়ে যে গাড়ীটা গেল- পরিস্কার বোঝা গেল, এটা প্রধানমন্ত্রীর গাড়ীর বহন নয়। তবু গাড়ীর বিদঘুটে হর্ন বেজেই চলেছে। সুজনের মনে হচ্ছে জবাইয়ের আগে পশু যেভাবে আর্তনাদ করে; তেমনি শব্দ করে চলে গেল ভিআইপি গাড়ীবহর।
এরপর প্রায় বিনা বাঁধায় সে পথ চলেছে- অবশ্য নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে; রাস্তার বাম দিকের ফুটপাথ ধরে। আইন বলে- রাস্তার ডান দিকে চলবে মানুষ- বায়ে যান্ত্রিক বহর। কথাটা মনে হতেই হাসি পায় তার। সে কি আসলেই মানুষ; না কি যান্ত্রিক কিছু একটা!
যান্ত্রিক কিছু একটা না হলে সে যন্ত্রের মত জীবনের চারটা দশক পার করলো কি করে! বাবা-ঠাকুর দা’র দেয়া সুজন গাঙ্গুলী নামটা বদলে ফেললো কি করে? পাঠক, জেনে নিন- আলোচ্য সুজন এক সময়ে ছিলো- সুজন কে গাঙ্গুলী। বাংলায় লিখতো সুজন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। যখন থেকে সে বুঝতে শিখেছে- মানব ধর্মের চেয়ে বড় কিছু নেই; তখন থেকে সে হয়ে গেছে সুজন; কেবলই সুজন। ইউরোপীয় কায়দায় তার ফার্স্ট নেম আর লাস্ট নেম বলে কিছু থাকলো না। ফলে ইদানিং অনলাইনে কোন তথ্য ফরম পূরণ করতে গেলে; শেষতক তার নাম দাড়ায় সুজন সুজন। ফার্স্ট আর লাস্ট নেম একটাই। মিডেল নেম এর কোন অপশনতো আর ম্যান্ডেটরী নয়। ফলে নেটের বন্ধুরা বেশ আগে থেকেই তাকে সম্বোধন করে ‘সুজন স্কয়ার’ বলে।
এই সুজন কে গাঙ্গুলী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ভালবেসে, জাত-পাত খুইয়ে একটি উচ্চ বংশীয় মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছিল। জাত-পাত নিয়ে সুজনের কোন দুঃশ্চিন্তা ছিল না বলেই খুব সহজে বাবা-মায়ের অমতে সানজিদা চৌধুরীকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিল। বিষয়টা মনে হতেই পাঞ্জাবী নাকের সরু ছিদ্র দু’টো দিয়ে ঠান্ডা বায়ু নির্গত হয়; হৃদপিন্ডের নীচে হালকা একটা চাপ অনুভূত হয় তার।
তালতলার কাছে আসতেই একটু ঝামেলার মত মনে হল। সারিবদ্ধ প্রাইভেট কার দাড়িয়ে- গ্যাস নেয়ার জন্য। ছুটির দিনে, বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে ঢাকা যখন একেবারেই ফাঁকা তখন এই সারিবদ্ধ গাড়ী দেখতে খুবই বেমানান লাগছে।  ওই জায়গাটুকু অতিক্রম করতে গিয়ে মনে মনে গালি দেয় গাড়ী চালকদের। আজ ওরা যেন সবাই রিক্সা চালক; দু’টো গাড়ীর মাঝখানে যে পরিমান ফাঁকা থাকার দরকার, তা নেই। সুজন ভাবে নিশ্চয়ই এ সব চালক পেশা হিসেবে শুরুতে রিক্সা চালনাকেই বেছে নিয়েছিল।
রোকেয়া সরণিতে ব্লু লেগুন বলে একটা নামী রেস্তোরাঁ রয়েছে- আগারগাঁ ও মিরপুরের সঙ্গম স্থলে। বহু বছর আগে ঐ রেস্তোরাঁর ধারে কাছে কোন ভবন ছিল না; এমনকি রেস্তেরাঁটাও ছিল জলাশয়ের ওপরে মোটা মোটা পিলারের ওপরে। ভরা বর্ষায় বেশ ভাল লাগতো সেখানে বসতে। সুজনও দু’একবার সেখানে বসে পর্যটনের স্বাদ নেয়ার চেষ্টা করেছে। অবশ্য সে সময়ে রোকেয়া সরণিতে যানবাহনের চাপ এতটা ছিল না। সেই রেস্তোরাঁর কাছে আসতেই পুরানো দিনের কথা ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয়ে ভর করে তার। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমাকাশ দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। আশ-পাশের উঁচু ভবনগুলো মুখ বাঁকিয়ে ওর দিকে তাকায়; ফলত তার মনে হয় কিছুটা হলেও তার শরীরে ঘাম জমেছে। মনের রঙ সবসময় ছয়টা থাকে না। এক্ষণে ওর মনে হলো পিঠের মধ্যখানে- যেখানে শীর দাড়া রয়েছে- সাধু ভাষায় যাকে বলে মেরুদন্ড; ওখানটায় ঘামের স্রোত বইছে। অভ্যেস বা বদ-অভ্যেস, যা-ই হোক না কেন হাতটা পেছনে নিয়ে টি-শার্টের ভেতরে চালান করে ঘাম মুছে ফেলার চেষ্টা করতেই- খিল্ খিল্ করে কচি নারী কণ্ঠের হাসি কানে ভেসে অসে। তাকিয়ে দেখে, চৌদ্দ-ষোল বছরের দু’টি মেয়ে হাসতে হাসতে তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলছে এবং একে অপরকে বলছে:
-চুপ, শুনতে পাবে।
চুপ করেনি কেউই; বরং দু’জনে পেছন ফিরে আরেকবার সুজনকে দেখে নিয়ে দ্রুত পথ চলতে তাকে।
চল্লিশোর্ধ সুজনের খোলা পৃষ্ঠদেশ দেখে ওরা যখন হাসে- পুলকিত হয়; তখন কিশোরী বা যুবতীর উন্মুক্ত পৃষ্ঠদেশ এক যুবক বা প্রৌঢ়ের কাছে মহা আনন্দের বিষয় হবে; তাতে দোষের কি! সুজন নিজেও কি দেখেনি বা দেখার চেষ্টা করেনি কখনো?
নারী পুরুষের এই আকর্ষণ চিরন্তন এবং ঈশ্বর প্রদত্ত। এ কারণেই পৃথিবীর অবয়ব না বাড়লেও বেড়ে চলেছে মনুষ্য জনগোষ্ঠীসহ তাবৎ প্রাণীক‚লের পরিধি।
এমনই এক আকর্ষণে সুজন আজও ছুটে চলেছে মিরপুরের কোন এক প্রান্তে এবং পদব্রজে। হঠাৎ করেই তার মনে খটকা লাগলো, কেন সে রিক্সা বা স্কুটার খুঁজলো না! কেনইবা হেঁটে চলেছে এতটা পথ! প্রশ্নের উত্তর জানা নেই সুজনের; পথ চলাও থেমে নেই।
শেওড়াপাড়ার ফুটপাথ সাধারণত সবসময়ে ফল-ফলাদির দোকানে ভরা থাকে। আজ অবশ্য তেমনটি নেই। বরং রাস্তার ধারে সকালে কোরবানী দেয়া গরু ছাগলের রক্ত, কিছুটা গোবর এবং কোরবানীর আগে উৎসর্গীকৃতদের ভোজনের জন্য দেয়া খাবারের কিছু উচ্ছিষ্ট এখনো রয়ে গেছে। তুলনামূলকভাবে ফুটপাথটাই হেঁটে চলার জন্য উত্তম মনে হয় তার কাছে।
এমনিতরো জীবনের স্বর্ণালী দিনগুলোর কোন এক সময়ে সানজিদা চৌধুরীও বোধকরি সুজন কে গাঙ্গুলীর সাথে ঘর বাঁধাটা তুলনামূলকভাবে উত্তম মনে করে ছিল। সুজনও সম্ভবত উত্তম সময় ভেবে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্নই বা বলা কেন; বাস্তবে তারা  একই নীড়ে নীবিরভাবে বসবাস করেছিল। পঞ্চাশ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কোন এক মহাকুমা হাকিমের দপ্তরে দু’জন বাঘা উকিল স্বাক্ষী রেখে স্বাক্ষর করে বন্ধু থেকে স্বামী-স্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়েছিল তারা। সেখানে অবশ্য ‘কে গাঙ্গুলী’ বাদ দিয়ে কেবলই ‘সুজন’ লেখা হয়েছিল। হাকিম সাহেব বা উকিল- কেউ-ই সুজনের পুরো নাম জানতে চায়নি। সুজনের বাবার নামটা লেখার সময় উকিল কি যেন জানতে চাইলে সানজিদাই উত্তর দিয়েছিল।
বেশ সুখেই দিন কাটছিলো। সানজিদা আর সুজনের ভালবাসার ফসলও এসেছিল বছর দুয়েক বাদে। বড় আদর করে সুজন নাম রেখেছিল সুমনা।
না, সে এখন আর সুমনা নামে পরিচিত নয়। অন্য কোন নাম হয়ে গেছে তার। নামের শেষে চৌধুরীও যোগ হয়েছে। কত বড় হয়েছে মেয়েটি- সুজন জানে না। সানজিদা জানতে দেয় না। সুমনার কি মনে আছে বাবার কথা? স্মৃতিপট থেকে হারিয়ে যাবারই কথা। মাত্র দেড় বছর বয়সে সুমনা হারিয়ে যায় সুজনের জীবন থেকে।
সানজিদার বাবা, সুজনের শ্বশুর; মস্ত ব্যবসায়ী- মেয়ে আর নাতনীকে দূরে পাঠিয়ে দেন। শ্বশুর অবশ্য এ কাজে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন; বলেছিলেন- ওদের আমেরিকা বেড়াতে নিয়ে যাবেন। সুজনকেও প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল; সুজন অবশ্য রাজী হয়নি।
আমেরিকা যাবার সময় সানজিদার অনুনয়-বিনয়ে সুজন চৌধুরী সেজে নীল রঙের একটা কাগজে স্বাক্ষর করেছিল সে- যা কাবিননামা হিসেবে সকলে জানে। সুজন পড়েও দেখেনি কি কি লেখা হয়েছিল ঐ নীল রঙের কাগজটায়। আমেরিকার ভিসা পাবার জন্য ঐ কাগজটা নাকি খুবই দরকারী ছিল।
তিন মাস পরে, সুজনের কাছে আরেকটি নীল রঙের কাগজ এসেছিল রেজিস্টার্ড ডাকে, আগেরটার থেকে খানিকটা ছোট আকারের; যা তালাকনামা হিসেবে সকলে জানে। সুজন সব বুঝলেও তালাকের কারণ হিসেবে কি লেখা ছিল তা কখনো পড়ে দেখেনি।
ভুত দেখার মত সুজন দেখে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়ার মাঝামাঝি একটা জায়গায় ফুটপাথের ওপর একটি চায়ের স্টল খোলা রয়েছে। অবাক হয় সে- আজ তো চায়ের দোকান খোলা থাকার কতা নয়! দাঁড়ায় সে; চায়ের ফরমায়েস দেয়। আবারো মুখাগ্নি ঘটায় পশ্চাৎদেশে হালকা সোনালী রঙের ফিল্টারসহ সাদা সিগারেট মুখে নিয়ে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মোবাইলটা হাতে নেয় হিপ পকেট থেকে। সুজন বরাবরই হিপ পকেটে মোবাইল রাখে- এ নিয়ে বন্ধু মহলে কত কথা হয়েছে- ভেঙ্গে যাবে, হারিয়ে যাবে। সুজন শোনেনি- ওর স্বভাবটাই এমন; যদিবা স্কুটারের সিটে হিপ পকেট থেকে পড়ে গিয়ে মোবাইল হারিয়েছে সে একবার।
অপর প্রান্তে দু’টো রিঙ বাজতেই উত্তর পাওয়া গেল
- কোথায়?
- কাজীপাড়া।
- ওখানে কেন?
- তোমাদের দিকে আসছি।
- কতক্ষণ লাগবে?
- চল্লিশ মিনিট বা তারও বেশী।
- এত কেন, রিক্সায়?
- না, এগারো নম্বর বাস।
রোকেয়া সরণি হয়ে এগার নম্বর বাস চলে না, সুষ্মিতা তা ভাল করেই তা জানে; তাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করে:
- মানে?
- মানে হেঁটে আসছি।
- কেন? কোত্থেকে হেঁটে আসছো?
মৃদু হেসে সুজন বলে:
- একটা একটা করে প্রশ্ন করো, এক সাথে দু’টো প্রশ্নের জবাব দেব কি করে?
- হেঁটে আসছ কেন?
- মন চাইলো, তাই।
-কোত্থেকে হেঁটে আসছে?
- বাঙালী জাতির ঐতিহাসিক ঐক্যের প্রতীক জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোন থেকে।
- কেন?
- এসে বলবো, কেমন!
- পাগলামী, তাই না! জলদি রি·া নাও।
- দেখি।
কথা বাড়ায়নি কেউ-ই। চা পর্ব শেষ করে আবারো পথ চলে সুজন। ওর গন্তব্য মিরপুর।
আকাংখিত মানবী সুষ্মিতা, সুমাইয়া চৌধুরী। চাকুরে বাবার একমাত্র মেয়ে। চৌধুরী পিতৃক‚লের পদবী নয়; স্বামীর বংশ মর্যাদা। ওর বাবা সৈয়দ বংশের। পিতৃভক্ত সুষ্মিতা স্বামীর বংশ মর্যাদা ধারণ করে আছে আজও। সেই সাথে স্বামীর দেয়া অনন্য উপহার মৌমিতা। বয়স বার বছর। ইরেজি মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড-টু ক্লাসে পড়ছে।
মিরপুর দশ নম্বর গোল চক্করে এসে প্রকৃতার্থে চক্করে পড়ে যায় সুজন। হিপ পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে ওঠে ফোনটা মাধবীর:
- কোথায় আছ?
- মিরপুর।
- ওখানে কেন?
- কাজ আছে।
- ঈদের ছুটিতে কি কাজ ওখানে?
- আমারতো ঈদ নেই, পুজোও নেই।
- রমনায় আসবে?
- রাত হবে।
- কোথায় যাচ্ছ?
- পরে বলবো।
- আমি কি অপেক্ষা করবো?
- না, আজ নয়; কাল দেখা হবে।
কথা প্রলম্বিত হয় না। মাধবী অভিমান করে লাইনটা কেটে দেয়।
মাধবী, মাধবী রানী গুহ। সুজনের কলিগ; একত্রে ওরা কাজ করে একটি দৈনিকে। মাধবী মফষ্মল পাতা দেখে, সুজন বিজ্ঞাপন বিভাগে। তবু কেন যেন মাধবী সুজনকে লাইক করে; হয়ত স্বধর্মী ভেবে। মাধবী সুজন থেকে অন্তত দশ বছরের ছোট হবে বয়সে। তবু ওদের মধ্যে সম্পর্কটা ‘তুমি’ পর্যায়ে। সুজনের ‘আপনি’ সম্বোাধনটা একেবারেই অপছন্দ; তবু অপরিচিতজন বা বয়স্কদের আপনি-ই বলতে হয়। কারো সাথে বছরখানেক সম্পর্ক রয়েছে- এমন কাউকে সে আপনি বলছে- এমন মানুষ মেলা দুষ্কর।
চাকুরে বাবার মেয়ে সুষ্মিতা বহুজাতিক কোম্পানির পাবলিক রিলেশনে কাজ করে। চাকুরীর সুবাদেই সুজনের সাথে পরিচয়- বছর দুয়েক হবে। পরিচয়ের ছ’মাসের মধ্যেই সম্বোাধনটা তুমিতে চলে এসেছে। এর কারণও অবশ্য রয়েছে। অনেক কারণের একটি হাস্যকর কারণ হলো, ওরা দু’জনেই পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে ভালবাসে। রমনা, সোহরাওয়ার্দী বা চন্দ্রিমা উদ্যানে ওরা নিদেন পক্ষে বারটি পূর্ণিমা উপভোগ করেছে এরি মধ্যে।
দু’একবার চাঁদের উপমায় সুষ্মিতার নাম সুজনের ঠোঁট গলে বেরিয়েছে বটে। সুষ্মিতাও বলেছে:
- তুমি কি মুসলমান হতে পার?
- হয়েছিতো!
- কই! দেখছি না তো।
- সানজিদার নীল কাগজে লেখা আছে।
- ওটাতো ভুয়া, মেকি। আসলে মন থেকে হতে হয়।
- হলে কি হবে?
- তুমি আমি এক হব।
- এমন ভাবছ কেন?
- তোমার মত বন্ধু কি আর পাব?
- চেষ্টা করেছ কখনো?
সুষ্মিতা সরাসরি উত্তর না দিলেও সুজন জেনেছে ওর জীবন কথা। মৌমিতার বাবা চৌধুরী সাহেবের করুন পরিনতি; জেনেছে সুষ্মিতার জীবন সংগ্রামের কথা। বাবা তার জন্য নিশ্চিত আশ্রয় দিয়েছেন বটে, জীবন সংগ্রামে অন্য কোন ভাবে সহায়তা করেন নি। তবু সে বাবার কাছে কৃতজ্ঞ। ঐ ঠাঁইটুকু না পেলে মৌমিতাকে নিয়ে তার দুঃসময় কিভাবে কাটতো- ভেবে পায় না সে।
দশ নম্বর গোল চক্কর থেকে সোজা যাবে না বাম দিকে মোড় নেবে; ভাবতে ভাবতে আরেকটা সিগারেট ধরায় সুজন।  কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। এমনি সময়ে সোনালীর ফোন- ছেলে বেলার বন্ধু;  থাকে যাত্রাবাড়ী। স্বমী সন্তান নিয়ে সুখেই আছে। ফোনটা রিসিভ করতেই
- কিরে, এলিনা কেন?
- আমি একটু দূরে আছি; আজ আর আসবো না।
- দুপুরে খেয়েছিস?
- হুম।
- কোথায় খেলি? তোর কোন্ বান্ধবী খাওয়ালো রে?
- না রে, আমিই খেয়েছি। ডাল আর ডিম।
- এভাবে কদ্দিন চলবে? পুজার দিনও এলি না; ঈদের দিনও না; কবে আসার সময় হবে তোর?
- বড় দিন তো বাকী আছে। অপেক্ষা কর, আসবো।
- তোর জামাই বাবু বসেছিল তোর জন্য।
- বলে দে, বড় দিনে একসাথে খাব।
সোনানী জানে সুজন এমনি বাউÊুলে। খাবার হিসেব নেই, চলার তো নয়ই। কেবল একটা জায়গায় সে পারফেক্ট- তা হলো কাজ। কাজে তার কোন ফাঁকি নেই কোন দিন। সে জন্য সোনালীর স্বামী সুজনকে নিজের কোম্পানীতে কাজ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে আশংকায় সুজন সেই আগ্রহে সাড়া দেয়নি।
অবশেষে ইনডোর স্টেডিয়ামের দিকে এগোতে থাকে সুজন। তার গন্তব্য মিরপুর সাত ন¤^র সেকশনের সাত নম্বর রোডের সাত নম্বর বাড়ীর সাত তলার ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট নম্বরটাও সাতের ঘরে, ইংরেজীতে ‘জি’। সাধারণত কোন উঁচু ভবনের ফ্ল্যাট নম্বর হয় প্রতি তলার ফ্ল্যাট ধরে ধারাবাহিকভাবে। ওদের ফ্ল্যাটটের নম্বরের ধারাবহিকতা হয়েছে নীচ থেকে উপরে; এমনটি করে- নীচ তলার প্রথম ফ্ল্যাটটি ‘এ’; এর পরে দোতলার ঠিক ওপরেরটি ‘বি’- এভাবে। সুজন বাড়ীওয়ালার রুচির তারিফ করে মনে মনে।
কল বেল বাজানোর সাথে সাথেই দরজা খোলে সুষ্মিতা। মনে হলো দরজা খোলার জন্যই হয়তবা সে দাড়িয়েছিল ঠাঁয়। মুখদর্শনে চমকে যায় সুজন।
বসার ঘরে সোফায় আরাম করে বসেই
- এক গ্লাস পানি দেবে?
হাসিমুখে উঠে পানি দিতে দিতে বলে সুষ্মিতা
- এমন পাগলামী না করলে হতো না?
- তা হলে চলে যাই?
- যাও তো দেখি!
সুষ্মিতা জানে, সুজন এতটা পথ হেঁটে এসে ক্লান্ত; মুখে বললেও সে এখনই উঠবে না। সুজন নিজেও এখনই ওঠার জন্য আসে নি এতটা পথ।
সুষ্মিতা বাঙালী ঢঙ্গে শাড়ী পড়েছে। একেবারেই সাদাসিধা আটপৌঢ়ে শাড়ী। হালকা সবুজ রঙের ব্লাউজের গলাটা একটু বড়। এমন ব্লাউজ পড়ে সে বাড়ীর বাইরে যায় না কখনো- একটু ঢিলে-ঢালা; বেশ লাগছিলো তাকে। প্রকান্ড গলার ব্লাউজের ওপর সাদা এবং তার ওপরে সাদা সুতোর কাজ করা শাড়ীর আঁচল ডান হাতের নীচ থেকে পয়তাল্লিশ ডিগ্রী কোনে বাম কাঁধের ওপর পেচানো। গলায় সরু স্বর্ণের চেইন। বুকের মাঝখানে, যেখানটায় ছোট একটা শীর্ণধারা দৃশ্যমান, লাল পাথর বসানো লকেটটা সেখানে সেঁটে আছে। ওটা সুষ্মিমতার সৌন্দর্য বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে। এক নজরে তাকিয়ে সুজন; যেন গোগ্রাসে গিলছে তার সৌন্দর্য।
দার্জিলিং এর টাইগার হিলে উঠে প্রত্যুষে কাঞ্চজক্সঘা ও হিমালয়, দুটোই দেখেছে সুজন- বহুবার। তুলনামূলকভাবে কাঞ্চজঙ্ঘই ভাল লেগেছে তার। তবে প্রকৃতির কাঁচুলী জড়ানো উই ঢিবি দেখতে সব থেকে ভাললাগে তার কাছে- বান্দবানের নীলগিরীতে। সারিবদ্ধ টিলা, সবুজ রঙের কাঁচুলী জড়িয়ে পুরো বান্দরবানের সৌন্দর্যকে সত্যিকার রমনীয় করে রেখেছে। সুষ্মিতার দিকে তাকিয়ে সামনে নীলগিরী থেকে দেখা বান্দরবানকেই দেখছিল সুজন।
সুষ্মিতা জানে সুজনের স্বভাব। তাকিয়ে থেকে দেখায় তার জুড়ি নেই। নীরব দর্শক হিসেবে সুজনের চেয়ে উত্তম কাউকে পাওয়া যাবে না। তাই সেও তাকিয়ে থাকে সুজনের দিকে। কতক্ষণ! এক মিনিট, দুই মিনিট; না কি তারও বেশী! সুজনের মত নীরব দর্শক সে নয়, তাই
- ক্লান্ত শরীরে অমন করে কি দেখছো?
- কাঁচুলী জড়ানো নীলগিরী।
এবারে সুষ্মিতা শাড়ীর আঁচল ঠিক করার চেষ্টা করে, যদিবা ওটা আগে থেকেই সঠিক জায়গাতেই ছিল।
- হাত যখন লাগালেই, আঁচলটা নামাও না!
- ধ্যাত!
- কেন, ভরসা হারিয়ে গেছে?
- চোখে কোন জড়তা নেই তোমার?
- না!
- হেঁটে এলে কেন?
- মন চাইছিল, তাই।
- আমায় ই¤েপ্রস করতে চাও?
- বলতে পারো, আবার নাও বলতে পারো।
- এতটা পথ কোন পাগলেও হাটে না!
- আমি তো পাগল নই।
- তুমি মহাপাগল।
এবারে দু’জনেই হাসে।
উঠে দাড়ায় সুষ্মিতা। চা বানানোর জন্য ছুটি চায়। সুজনও সায় দেয়। সুষ্মিতার প্রস্থান লক্ষ্য করলেও সহসা সোফায় শরীরটা এলিয়ে দেয় সুজন।
গুলশান বনানীর সীমানা নির্ধারণী লেকের ওপরে নতুন তৈরী সেতুর ওপর দাড়িয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখবে সুষ্মিতা আর সুজন। মেঘলা আকাশ ওদের আনন্দের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে এরি মধ্যে। তবু মাঝে মধ্যে হালকা কালো-সাদা মেঘের ফাঁকে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ যখন আকাশে হেসে-খেলে ছুটে চলে অবিরাম, লেকের জলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে হাজারো চন্দ্রকণার কৃত্রিম ও ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি বেশ উপভোগ করে ওরা। শরতের প্রথম পূর্ণিমা; প্রথাগতভাবেই খন্ড খন্ড সাদা আর ছাই রঙের মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ভরা যৌবনা নারীর মত প্রস্ফুটিত র্পূণ চাঁদ। 
যখন ওরা লেকের ধারে পৌঁছায়, তখনও চাঁদ ছিল মেঘে ঢাকা। সুষ্মিতা মন খারাপ করে বলে
- ভাগ্যদেবতা আমাদের অনুক‚লে নয়, চলো ফিরে যাই।
- এসেছি যখন, একটু বসে যাই।
সেতুর ওপরেই দাড়ায় ওরা। লোক-জনের বেশ আনাগোনা। গল্প করে সময় কাটানোর জন্য দারুন একটা জায়গা। ওদের সময়টা বেশ কাটে! ওরা দু’জনেই পূর্ণ চাঁদ ভালবাসে; জীবনের পূর্ণতা পায়নি বলে হয়তোবা।
সুষ্মিতার মত সংগ্রামী নারীকে শ্রদ্ধা করে সুজন। নিজে কাজ ভালবাসেই বলেই হয়ত। সুষ্মিতাকে সংগ্রামে উৎসাহ দেয়, সাহস জোগায়। বিনিময় একটাই- একত্রে পূর্ণ চাঁদ দেখা।
না, ওদের চাওয়া-পাওয়ার গন্ডি এখনো সীমানা  অতিক্রম করেনি।
সীমানা অতিক্রমে সুজনের একটা নিজস্ব মতামত রয়েছে। ছেলে বেলায় এনুয়েল স্পোর্টস্ এ তিন পায়ের দৌড় বলে একটা খেলা হত। দু’জন প্রতিযোগী মিলে তিন পায়ে দৌড়াতে হতো। একজনের ডান পায়ের সাথে অন্যজনের বাম পা বেঁধে দেয়া হত। দু’জনের তখন কর্মক্ষম পা তিনটি। সেই জুটি সবচেয়ে ভাল দৌড়াতে পারতো, যাদের মধ্যে পারষ্পরিক সমঝোতা বা একসাথে দৌড়ানোর ইচ্ছেটা একসাথে হতো; তারাই প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান দখল করতো।
নারী পুরুষের সম্পর্কের সীমানা অতিক্রমের ক্ষেত্রেও এমনি ইচ্ছে শক্তি বা একে অপরকে পাওয়ার ইচ্ছেটা জন্ম নিতে হয়; একজন চাইলেই তা পূর্ণ হবার নয়।
রাত বাড়ে; সুষ্মিতা ফেরার তাগিদ দেয়। সুজন অসম্মতি জানিয়ে বলে:
- আমি পূর্ণিমার স্বাদ নেব, ঈশ্বর তা হতে দেবেন না- এমনটি হতে পারে না। আধা ঘন্টা অপেক্ষা করো, মেঘ না কাটলে চলে যাব।
সুজনের অপ্তবাক্যে সুষ্মিতা রাজী হয়। সে বহুবার দেখেছে ধর্মহীন মানুষটার একটা শুভ পরিনতি আছে। ধর্মীয় অনুশাসন না মানলেও তার চলার পথে বক্ররেখার কোন উপস্থিতি নেই। তার চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে-মেলে সবসময়ে, তবে ঠিক পৌরে বারটায়।
চা নিয়ে ফিরে এসে সুষ্মিতা দেখে সুজন ঘুমিয়ে গেছে সোফায়। মাথায় হাত রেখে ডাকতে যায় সে- তখনই চোখ মেলে তাকায় সুজন।
- বড্ড ক্লান্ত, তাই না?
- হুম! তবে, সেই রাতে আমরা ঠিক পূর্ণিমার চাঁদ দেখেছিলাম, তাই না?
হেসে ফেলে সুষ্মিতা। কাবাবের প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলে:
- তোমার জীবনটাইতো পৌনে বারটায় বাঁধা।
সুজনও হাসে। গরুর মাংসের গরম কাবাব হাতে নিয়ে বলে:
- এত অল্প সময়ে করলে কি করে?
- সবই তৈরী ছিল, কেবলি তেলে ভাজার কাজটা করেছি। নাও, ঠান্ডা হয়ে যাবে।
সুজন এলেই নিজের হাতে বানানো খাবার খাওয়াতে পছন্দ সুষ্মিতার। কারণ হয়তো সুজনের ভাল কাওয়া হয় না বহুদিন ধরে, তাই। সুজনও বিষয়টা বেশ উপভোগ করে। এমনও দিন গেছে, সুজন আসার পর ভাত সাংস রান্না করে খাইয়েছে সে।
সুষ্মিতার সবই পছন্দ সুজনের; কেবল ধর্মবিশ্বাস ছাড়া। সুজনও মানব ধর্মের বাইরে যেতে চায় না। সে কারণেই কাঁচুলী জড়ানো ধরণীর কাছাকাছি যাওয়া হয়ে ওঠেনি সুজনের। সুষ্মিতা বহুবার বলেছে:
- আমার জন্য অন্তত এই টুকু করে দেখাও।
- নিজের সাথে প্রতারণা করতে বলো?
- তা কেন?
তা নয়তো কি? যা আমি বিশ্বাস করিনা, সেইটে করা বা বলাই তো নিজের সাথে প্রতারণার সামিল।
- সানজিদাকে তো এমনি একটা কাগজ দিয়েছিলে তখন!
কথাটা বলেই দাঁতে জিব কাটে সুষ্মিতা। সুজন কিছু বলার আগেই বলে:
- তোমায় কষ্ট দেয়ার জন্য কথাটা বলিনি সুজন।
সাবলিল ঢঙে সুজন উত্তর দেয়:
- ওটা দিয়েছিলাম ওর বিদেশ যাওয়ার সুবিধের জন্য। কাজটা অন্যায় ছিল বলেই হয়ত ওকে আর ফিরে পাইনি।
- এ জন্য কষ্টবোধ আছে তোমার?
- থাকলেই বা করার কি আছে, বল?
কথা বাড়ায়নি সুষ্মিতা; সুজনও না। প্রসঙ্গ বদলে সুজন এমনটি বলে:
- ধরণীর বুকে সমর্পিত না হতে পারলেও দর্শনে কোন দোষ থাকার কথা নয়।
সুষ্মিতা বোঝে- সুজন কি বলতে চাইছে। চোখের ভাষায় সে বলতে চাইছে:
- এমনটি আব্দার করোনা গো!
একই ভাষায় সুজনও বলে:
-তাই হোক। আমরা না হয় রেল লাইনের মত সমান্তরালে চলতে থাকি; সেটাই উত্তম পথ। দেখা হবে, কথা হবে, দূর থেকে দৃশ্যমান হবে- দূরে কোথায়ও আমরা মিলিত হয়েছি; প্রকৃতার্থে তা হবার নয় কোনও দিন!
সাদামাটা “আল্লাহ হাফেজ” শব্দে বিদায় জানায় সুষ্মিতা; সুজন অবশ্য বলে “খোদা হাফেজ”।
রিক্সা ব্লু লেগুর অতিক্রম করছে। হেমন্তের আকাশে একাদমীর চাঁদ মেঘে ডেকে আছে। সুজন জানে খানিক বাদে একাদশীর চাঁদ মেঘমুক্ত হবে। সোডিয়াম বাতির কিম্ভুতকিমাকার রঙে উদ্ভাসিত ঢাকায় ঐ চঁ দের আলোর বন্যা কোনই আবেদন তৈরী করতে পারবে না। ঢাকাবাসী উপভোগ করতে পারবে না একাদশী চাঁদের অপূর্ব রূপ ও রস।
বাসায় ফিরে নিত্যকার অভ্যেসমত চা তৈরী করে বিছানায় চারটে কুশন দিয়ে কৃত্রিম টেবিল বানিয়ে বই নিয়ে বসে; পাশে কাগজ কলমতো রয়েছেই।
চারিদিকে নীরব- নিত্যকার মত। সুজন বুদ্ধদেব গুহ’র ‘বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে’ নিমগ্ন। বনে-জঙ্গলে গুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার চোখের গতি থেমে যায় একটি চরনে, “নারীমাত্রই জলের মত। কোথায় যে তারা কখন গড়িয়ে যায় স্বভাবেরই কারণে, তা শুধু ঈশ্বরই জানেন।” তখনি মুঠোফোনে সর্ট মেসেজ, যা এসএমএস নামে সকলে জানেন; প্রাপ্তির ঘোষণা। গত দু’তিন দিন ধরে ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপক সর্ট মেসেজ ডিলিট করতে করতে সুজনের বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল বিরক্ত হয়ে গেছে। ডান হাতে ফোনটা নিয়ে অবাক হয় সে, সুষ্মিতা লিখেছে:
“কিছু কিছু বিদায় সুখের হয় না। আজ ঠিক তাই হল। একটা কি যেন অপূর্ণতা ছিল”।
সর্ট মেসেজ পাঠাতে সুষ্মিতার জুড়ি নেই। কোন কোন দিন ৫টা বা তারও বেশী সর্ট মেসেজ পাঠায় সে। সুজন সেগুলো সুন্দর করে লিখে রাখে ডাইরীর পাতায়। বিষয়টা জেনে সুষ্মিতা বলেছিল:
- এটা পাগলামী ছাড়া কিছু নয়।
সুজন বলেছিল দৃঢ়তার সাথে:
- তোমার সর্ট মেসেজগুলো আগে-পরে সাজিয়ে সুন্দর একটা গল্প হতে পারে। দেখো, এই আমি একদিন এ অসাধ্য সাধন করে ফেলবো।
কথাটা মনে হতে দিন কয়েক আগে সুষ্মিতার পাঠানো আরেকটি মেসেজ আবারো পড়তে মনে চাইলো তার। মেসেজটির কথাগুলো ছিল এমনতরো:
“মনের মাধুরী মিশিয়ে ভাল লাগার মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছি বহুবার, পারিনি। পুজোর বলির জন্য উৎসর্গীকৃত পশুর মত হাতে-পায়ে শিকল আমার। মনটাতো আর ওরা বেঁধে রাখতে পারেনি। তাই উদ্যামে ছুটে যায় সেটি যখন তখন, সেথা খুশী সেথা। তাইতো মন ভরে কথা বলি, মিষ্টি প্রেমের কথা বলতে চাই। দুনিয়ার তাবৎ জটিলতার কাছে এ জীবন উৎসর্গীকৃত হলেও মনটা ভাললাগা আর ভালবাসার কাছে উৎসর্গীকৃত”।
এ দু’টো সর্ট মেসেজ সুজনকে ভাবতে শেখায়। ভাবতে বাধ্য করে সুষ্মিতার পূর্ণ গগণ নিয়ে। তবে কি সুষ্মিতার পূর্ণ চন্দ্র আলোক বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে? মনে হয় তাই; তবে আকাশের যেখানটায় পূর্ণ চন্দ্র, তারও অনেক অনেক নীচে কালো মেঘের ঘনঘটা। তাই দৃশ্যমান নয় সেই আলোর ছটা; এ যেন আষাঢের শুক্লপক্ষের ভরা পূর্ণিমার চাঁদ- আলো ছড়াচ্ছে- মনুষ্যকূল দেখতে পাচ্ছে না; ধরণী বঞ্চিত হচ্ছে  ভরা পূর্ণিমার আলোর বন্যার সৌন্দর্য থেকে।

২১ নভেম্বর ২০১২