বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৩

নদী সমুদ্র আকাশ

নদী সমুদ্র আকাশ
নুরুল্লাহ মাসুম

উত্তাল তরঙ্গ আছড়ে পরছে সাগরতটে। বঙ্গপোসাগরের বেলে মাটিযুক্ত সৈকতে আছড়ে পরা ঢেউগুলো বালির সাথে লুকোচুরি খেলে ফিরে যাচ্ছে সাগরের অথৈ বুকে। মাঝখানে ঢেউয়ের মাথার ফুটে থাকা ফুলগুলোর শ্বেতশুভ্র অসাধারণ সৌন্দর্য সমুদ্রের চোখ জুড়িয়ে দেয়।
সাগর তীরে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো অসংখ্য পাথরের একটার ওপর বসে আছে সমুদ্র, দক্ষিণ বাংলার সন্তান হয়েও সাগর পাড়ে বেড়ানো অভিজ্ঞতা তার বেশি দিনের নয়। যে কারণেই বারে বারে সৈকতে আছড়ে পরা ঢেউগুলো দেখতে তার ভালো লাগে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে সে ঢেউগুলোর দিকে। ঢেউগুলোর উৎস কোথায় জানে না সমুদ্র। তবে সাগরের বুকে সৃষ্ট ঢেউগুলোর সাতে নিজর একটা মিল খুঁজে পায় সে। জীবনের নানান চরাই-উৎরাই এবং সাগরের ঢেউগুলোর সৈকতে আছড়ে পরা, আবারো সাগরের ফিরে যাওয়ার মধ্যে দারুণ একটা যোগসূত্র আবিষ্কার করে সে। এতে করে মনটা আরও বেশি উদাস হয়ে যায়।
সূর্য পশ্চিমাকাশের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। লক্ষ-লক্ষ সূর্য যেন সাগরের বুকে লুকোচুরি খেলছে। সূর্য যত নিচে নামছে, সাগরের মাঝে ততবেশি সূর্য বেড়ে যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এ দৃশ্য আরও বেশি লোভনীয় হতো বলে তার মনে হয়। সেখানে পানি আরও বেশি স্বচ্ছ। শ্যাম উপসাগরের পানিও স্বচ্ছ। এখানে পানি ঘোলা বলে দৃশ্যটা তার কাছে কিছুটা হলেও ম্রিয়মাণ।
উঠে দাঁড়ায় সমুদ্র। সৈকতে লোকের ভিড় বেড়েছে। ঘণ্টাখানেক আগেও খুব কম সংখ্যক দর্শনার্থী ছিল, এখন কয়েকগুণ বেশি। ভিড়টা তার ভালো লাগে না।
একাকী হাঁটতে থাকে সমুদ্র, উত্তর দিকে। ও দিকটায় মানুষের ভিড় কম। দর্শনার্থী ওদিকটায় কম বলে পাথরের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি পাথরগুলো ময়লাও বেশি।
আরও সামনে আগায় সে; আরওথ আরও।
এদিকটায় গাছ-গাছালির সংখ্যা বেশি। কিছুটা অন্ধকারও বটে। আর এগুতে সাহস হয় না। নির্জনতা বেশ পছন্দ তার। তাই বলে নিরাপত্তার দিকটাও তাকে ভাবতে হয়। অন্তত একজন সাথী থাকলে আরও একটু এগুনো যেত। একটা গাছের পাশে দাঁড়ায় সমুদ্র। সূর্য তখন দিগন্তের একেবারে শেষ সীমানায়। অপূর্ব এক দৃশ্য। লক্ষ-কোটি সূর্য যেন সাগরের পানির মধ্যে জোটবদ্ধ হয়ে বিশাল লম্বাটে এক আকার ধারণ করেছে। দমবন্ধ করে অপরূপ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
- কি চমৎকার! তাই না?
বা দিকে তাকায় সমুদ্র। সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়
- অপূর্ব!!
ক্ষাণিকটা সময় কেটে যায়। সমুদ্র তখনো দিগন্তের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
আগন্তুকও চুপ করে দাঁড়িয়ে।
সূর্য সাগরের পানির নিচে হারিয়ে গেছে। আকাশ এবং সাগরের পানিতে তখনো তার আভা লেগে আছে। আগন্তুক আবারো বলে
- জায়গাটা নিরাপদ নয়; ও দিকটায় যাই, চলুন।
- চলুন।
বলে সমুদ্র হাঁটতে আরম্ভ করে।
- আমি নদী। পাহাড় তলী থাকি।
ক্ষাণিক বাদে সমুদ্র বলে
- বেশ নামতো আপনার। আমি সমুদ্র। গতকালই চট্টগ্রাম এসেছি।
পাশাপাশি হাঁটতে থাকে ওরা।
পুরো সৈকত জুড়ে তখন আধাঁর নেমে এসেছে।
নদী আর সমুদ্রের জানা-শোনার তিন মাস। নদী চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে থাকলেও আদিতে ওরা চন্দ্রদ্বীপের বাসিন্দা। বাবা বড় ব্যবসায়ী। ওদিকে সমুদ্র ঢাকার বাসিন্দা হলেও আদিবাস খলিফাতাবাদ। পরে এক পুরুষ চন্দ্রদ্বীপে। নিজেদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে একটা মিল যেমন ওরা খুঁজে পায়, তেমনি ওদের নামের মিলটাও চমৎকার। নদী পথ চলতে চলতে সমুদ্রে তার শেষ গন্তব্য। এটা স্বভাবিক নিয়ম। এক্ষেত্রেও তাই হয়। তিন মাসেই নদী আর সমুদ্র তেমনি গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যদিও গতি উল্টো।
সমুদ্রকেই আসতে হয় নদীর কাছে বারংবার।
তিন মাসে সমুদ্র কম করে হলেও নদীর কাছে পাঁচ বার এসেছে। প্রতিবারেই ওরা ওদের প্রথম সাক্ষাতের সেই গাছটার কাছে এসে বসে; নিরবে সময় কাটায়। সাগরের বুকে সূর্যের হারিয়ে যাওয়ায় দৃশ্য নয়ন ভরে অবলোকন করে। সময়ান্তে সমুদ্র ফিরে যায় ঢাকায়।
বর্ষাকাল। সাগরের বুক ভরা জল। ভরা যৌবনা কর্ণফুলি, বুক উজার করা ভালোবাসার ডালি সাগরের বুকে ফেলে দেয়। সাগরের বুকের সে ভালোবাসা উত্তাল তরঙ্গের আকারে আছড়ে পরে সৈকতে। মেঘলা আকাশের এমন এক দিনে সমুদ্র আর নদী কাছাকাছি; সৈকতের সেই গাছ তলায়।
- কেমন লাগছে? জানতে চায় নদী।
- মন্দ নয়। জবাব সমুদ্রের ।
- কেমন? আবারো জানতে চায় নদী।
- ভরা ভাদরের আনন্দ বেদনার মতো। উত্তর সমুদ্রের।
- এর পর দু'জনেই উদাস।
সন্ধ্যার মৃদু-মন্দ বাতাস হঠাৎ করেই গতি পায়। গাছের পাতায় ঝিরি-ঝিরি শব্দ। প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পায়।
নদী আর সমুদ্রের মধ্যে আসে জীবনের মাদতকতা।
হঠাৎ করেই ওদের জীবনের গতির পরিবর্তন হয়। তখনই ওরা ছক করে ফেলে সিলেট যাবে বেড়াতে; সম্ভব হলে পরদিনই।
হোটেলে ফিরে ঢাকায় ফোন করে সমুদ্র। বাড়িতে জানায় ফিরতে দেরি হবে। তখন তার চোখের সামনে জাফলং আর তামাবিলের অপরূপ প্রকৃতি। চট্টগ্রামের বিপরীত এক দৃশ্য।
ওদিকে নদীর বাড়িতে ভিন্ন দৃশ্য। পরদিনই সিলেট যাবার মতো ছক সে তৈরি করতে পারে নি। তাইতো ফোনে সমুদ্রেকে জানায়, আরো একদিন সময় লাগবে। ফোনটা পেয়ে সমুদ্র ভাবে, ভরা ভাদরের আনন্দ বেদনার কাব্য এমনিই হয়।
দু'দিন বাদে রাত দশটার ট্রেনে ওরা রওয়ানা হয় সিলেটে। প্রথম শ্রেণীর বার্থ। রাতটা ঘুমিয়ে কাটাবার কথা, বাস্তবে তা হয় না। সারা রাত ওদের কাটে না ঘুমিয়ে, হাজারও কথার মালা গাঁথতে গাঁথতে। দু'টো ভিন্ন জগতের মানুষ। একাকার হয়ে যায় ওরা – অন্তত কথার মালায়। যেন কত জনমের জানা শোনা ওদের। হঠাৎ করেই সমুদ্র জানতে চায়।
- তোমার ভয় করছে না?
- কিসের ভয়?
- আমাকে?
- কেন?
- আমিতো পুরুষ।
- তাতে কি?
- যদি অশুর ভর করে?
- তা করবে না।
- কি করে বুঝলে?
- বুঝতে পারি।
- কিভাবে?
- এমনিই।
এমনি নানান কথার মাঝে ওদের রাতটা পার হয়ে যায়। শেষ রাতে শ্রীমঙ্গলে এসে দু'জনেই সিদ্ধান্ত নেয় এখানেই নেমে যাবে, সিলেট যাওয়া হবে না। ট্রেন থেকে নামার আগে দু'জনার মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি হয়। সে মতেই ওরা পথ চলবে।
রাতের বাকি সময়টা ওরা স্টেশনের চায়ের দোকানে কাটিয়ে দেয়। ভোরের আলো ফুটলে রিক্সায় চা বাগানে। চট্টগ্রাম থাকতেই বাগানের রেস্ট হাউসের থাকার ব্যবস্থা করেছিল সমুদ্র। বাগানের ফটকে পোঁছতেই ছোকরা গোছের একজন ওদের অভ্যর্থনা জানায়। পরে ওরা জেনেছিল ছেলেটি বাগানের সুপারভাইজার।
বেলা আটটা নাগাদ ম্যানেজার হুমায়ূন কবীর ওদের সাথে দেখা করে। তার প্রথম প্রশ্ন
- সমুদ্র, তুমি বিয়েটা করলে কবে?
সমুদ্র তার কথায় সঠিক কোন উত্তর না দিয়ে বলে
- আপনার সৌজন্যে বৌ-ভাতটা এখানেই আয়োজন করবো।
সমুদ্র তার কথা রেখেছিল। চা বাগানের কর্তাগোছের লোকদের সম্মানে দু'দিন বাদেই আয়োজন করেছিল ডিনার পার্টির।
সকলের নাম আর আজ মনে নেই নদীর। তবে কাশেম, ইমরান, এমদাদ আর মতিউরের কথা আজও তার মনে আছে।
দিন সাতেক ছিল ওরা ওখানে। কাশেম আর মতিউর সব থেকে বেশি সময় দিয়েছিল ওদের। বাগানে ঘুরিয়ে দেখানো। কুলিদের বস্তিতে নাচ – গানের আসরে নিয়ে যাওয়া আর কমলা বাগান ঘুরিয়ে দেখানো, সবই করেছিল ওরা। কাশেমের কথা আজও মনে পড়ে নদীর, কি আন্তরিকভাবেই না নদীকে সে 'ভাবী' বলে ডেকেছিল।
সেই সাত দিনের কথা নদী আজও ভুলতে পারে নি। কোন দিন ভুলতেও পারবে না সে। চা বাগানের ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছিল ওরা দু'জন। না, কোন ক্লান্তি আসেনি সে দিন ওদের। অথচ আজ অল্পতেই ক্লান্তিতে কাতর হয়ে ওঠে নদী, আগের মতো মনযোগ দিতে পারে না কোন কাজে। সাত দিনের কোন সময়ই সমুদ্র কোন প্রকার অসহনীয় দাবী করেনি। অভিমান করে নদীও এক রাতে জানতে চায়
- কেন আমার এখানে এসেছি?
- বেড়াতে।
- শুধুই বেড়াতে?
- তা নয় তো কি?
- ওরা আমায় ভাবী ডাকে।
- তাতো ডাকবেই।
- তাহলে আমরা দূরে কেন?
- কই, যথেষ্ট কাছেই তো আছি।
- হাঁ, যা, এক ছাদের নিচে, তবে বহু দূরে।
সমুদ্র বোঝে নদীর কথা। তবে যথেষ্ট সাবধানী সে। গম্ভীর ¯^রে বলে
- বিপদে ডাকতে যাও?
- কিসের বিপদ?
- সামাজিক।
- যা হবার হবে, আমি সামলাবো।
এরপর ওদের ব্যবধান কমে। নদীর জল যে ভাবে সাগরে মেশে, সাগর যেমন নদীর জল নিজ বুকে ধারণ করে, তেমনি এক বাধাহীন স্রোতে মিশে যায় নদী আর সমুদ্র। পৃথিবীর তাবৎ বাধা দূর করে ওরা একাকার হয়ে যায়। কাশেম আর মতিউরের 'ভাবী' ডাক সার্থকতা লাভ করে।
মাস খানেক পর নদী আর সমুদ্র সিদ্ধান্ত নেয়-ওরা বিয়ে করবে। এর আগেই ওরা ঠিক করে অনাগত অতিথির নাম হবে আকাশ। নদী জানতে চায়।
- নামটা আকাশ হবে কেন?
- নদী সাগরে মেশে, আর সাগর আকাশে বিলীন হয়, তাই।
- যদি মেয়ে হয়?
- না ছেলেই হবে।
- যদি হয়?
- হোক, নামটা আকাশই হবে।
নির্ধারিত দিনে সমুদ্র ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসেনি। ঢাকা থেকে আসা সবগুলো ট্রেন চেক করা হয়। সমুদ্র কোনটাতেই আসেনি। ঢাকায় ফোন করা হয়। ঢাকা থেকে জানান হয় সমুদ্র চট্টগ্রাম গেছে।
কিছুদিন বাদে পত্রিকা আর টিভিতে সমুদ্রের নিখোঁজ সংবাদ ছাপান হয়। সমুদ্রের হদিস আর মেলেনি।
সামাজিক অপবাদ মাথায় নিয়েও নদী আকাশের জন্ম দেয়। সমাজ থেকে পালায় সে। আশ্রয় নেয় ভানুগাছ গ্রামে। কাশেম আর মতিউর তাকে সহায়তা করে।
সেই ভানুগাছ, যেখান থেকে সমুদ্রের দেয়া উপহার আকাশকে নিয়ে নদী ফিরে গিয়েছিল চট্টগ্রাম। অনাকৃতির আকাশ আজ আকৃতি পেয়েছে। বাস করছে মায়ের সাথে, সেই ভানুগাছ গ্রামে। আকাশ আছে, সমুদ্রের পরিচয়ে। নদী আছে সমুদ্রের পরিচয়ে; নেই কেবল সমুদ্র।
আকাশ আর নদীর থেকে সমুদ্র আজ বহুদূরে। দিগন্তের ওপারে ঠিকানা বিহীন কোন জায়গায়। নদী আজও সমুদ্রের অপেক্ষায়, তাকিয়ে সামনের দিকে নয়; আকাশ পানে।

গোলিকর চর

গোলকীর চর
নুরুল্লাহ মাসুম

বোশেখ মাসের বিকেল। কেরায়া নৌকায় করে যখন কাউখালীর কাছাকাছি পৌঁছালাম, মাঝি প্রায় চিৎকার করে আঞ্চলিক ভাষায় বলে ওঠে
-        সার, ওই দ্যাহেন একটা চর।
রোদের তীব্রতা উপো করে গাঢ় অথচ মোটা কাঁচের চশমার পেছনে লুকানো চোখ দু’টো দিয়ে ওদিকটায় তাকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। পশ্চিমে হেলানো সূর্য নদীর জলে হাজার রবির জন্ম দিয়েছে ইতোমধ্যেই। রবিরশ্মি যেমনি আঘাত হানছে অসংখ্য রবিকনা তেমনি আঘাত হানছে। কেরায়া মাঝির ‘ওই চর’ আর দেখা হল না। ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে বিজ্ঞের মতো প্রশ্ন করলাম
-        কতণ লাগবে?
-     ঘণ্টা খানেক।
বুঝলাম বেশ দূরের পথ। সন্ধ্যাও নেমে যেতে পারে, ভয় পেতে লাগলাম। চরে পৌঁছতেই যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়, ফিরবো কখন। সান্তনা পেতে চাইলাম
-        চরে থাকোনের মতো কোন জায়গায় আছে?
এক গাল হেসে পৌঢ়ত্বের কাছে হার মানা মাঝি জবাব দেয়
- থাকোনের জাগা পাইবেন কই? গোলকীর চরে মানুষ থাকে নাকি?
-        তাহলে?
-        বেলাবেলি ফিরা আইতে অইবো।
এবার বুঝলাম এবং নিশ্চিন্ত হলাম, ঘণ্টাখানেক দূরের পথ বলে মাঝি যে কথা বলেছিল সে পথটুকু যেতে ততটা সময় লাগবে না।
হাদিস অবশ্য বলেছিল স্টিমার থেকে নেমে গোলকীর চরে পৌঁছতে সাকুল্যে এক ঘণ্টা লাগতে পারে, যদি উজান বাইতে না হয়। সে হিসেব মতে তিনটে নাগাদ পৌঁছতে পারবো বলে ভাবতে চাইছি।
গোলকীর চর। পিরোজপুর জেলার একটা ছোট্ট চর। সাধু ভাষায় বললে বলতে হয় দ্বীপ। দণিাঞ্চলে এমন বহু দ্বীপ আছে, যা কোন দিন মানচিত্রে উঠবে না। বহু ছোট্ট চরের একটি গোলকীর চর। ঐ গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আমি একাকী এ পথে।
দৈনিক সান্ধ্য কাগজের একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রথম এ চরের প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সাথে মিশে আছে এর ইতিহাস।
১৯৪৭ সালের কোন এক সময়-অবশ্যই ১৪ আগস্টের পর, গোলক বানু আশ্রয় নেয় সন্ধ্যা নদীর এক নাম না জানা চরে। অন্যভাবে বলা যায়, তখনো চরটির নামকরণ হয়নি। দেশ ভাগ হয়ে গেল। গোলক বানু সকলের অলক্ষ্যে  আশ্রয় নেয় সেখানে। সাথে তার প্রাণের সখা ভূবনেশ্বর হালদার। ওদেও সম্পর্ক  স্বাধীন পাকিস্তনে কেউ মেনে নেবে না ভেবেই ওদের ঐ গোপন মিশন। ওরা এসেছিল সাগর পাড় থেকে। এখন আর কেউ জানে না ওরা মূলত কোন এলাকার বাসিন্দা ছিল।
মুসলিম প্রধান পাকিস্তনের নেতৃবৃন্দ মতার ভাগাভাগিতে ব্যস্ত। লোকাল লিডাররাও কেন্দ্রীয় নেতাদের তোষামোদে আরো বেশি ব্যস্ত। সে কারণে অসময়ে ঐ জমির খবর তখন তেমন কেউ নেয় নি। তাছাড়া চরটি তখনো ডুবো ডুবো। অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে চর ডুবে যায় ঘোলা জলে। তাই কারো নেক নজর নেই ওদিকে।
দিন কাটে। কালের হিসেবে পার হয়ে যায় অনেক গুলো বছর। দেশ রাজনীতি অর্থনীতি কোন কিছুই গোলক বানু আর ভ’বনের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেনা। ভূবনেশ্বর খেটে খাওয়া মানুষ। দিন মজুরীর কাজ করে দিন গুজরান করে। চরের মাঝে একটা খড়ের ঘর তুলে সংসার শুরু করেছিল অনেক আগেই, ওরা এখন তিনজন। সংসারের সীমানা বাড়ে নি। গোলক বানু শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহর কাছে। ভূবন ভগবানের কাছে নতজানু হয়ে কৃতজ্ঞতা জানায়। নবাকে নিয়ে ওদের দিন ভালই কাটে।
ভর অমাবশ্যা-পূর্ণিমার জোবায় পানি বাড়লে ওরা মাচা বানিয়ে দিন কাটায়। নবা জানতে চায়
-        মা আমরা এইহানে ক্যান?
-        এইটা আমাগো বাড়ি।
-        ক্যামনে আইলা নদীর মদ্যি?
-        আল্লাহ দিসে।
বাবা বলে-
-  ভগবানের কৃপায় এটা আমাদের বাড়ি হয়েছে। নদীর জল আর মাছ আমাদের দেবতা। জল আমাদের তি করে না, মাছ খাইয়া বাঁচি।
নবা মা-বাবা দু’জনকেই ভালোবাসে। প্রকৃতি নবাকে দুরন্ত বানায়। প্রায় সময় ওকে দেখা যায় নদীর জলে। ফিরবে মাছ নিয়ে। জাংলা দিয়ে মাছ ধরার কৌশল সে বাবার কাছে শিখেছে। শুকনার সময় লাউ গাছ, কুসির গাছ আর নানান পদের সবজির চাষ করে নবা।
এত কিছুর পর ওর একটা দুঃখ আছে। সেই দক্ষিণে কাউখালী, পশ্চিমে গাববাড়ি, পূর্বে আমড়াজুড়ি আর উত্তরে জলাবাড়ি, কোনটাই তার দেখা হয় নি। নিজের বাড়ি সম্পর্কে নবার  বাবা ভূবন বলে
- আমাদের বাড়ি গোলকীর চর।
একদিন গোলক বানু জানতে চায় স্বামীর কাছে
-        তুমি এইডারে গোলকীর চর কও ক্যান?
-        তোমার লাইগ্যা এই চর আমি পাইছি। এত বছর অইল, কেউ আহে নাই দখল করতে। এইডার মালিক তুমি। তাইতো এইডার নাম গোলকীর চর।
নবা মায়ের কাছে জানতে চায়
-        মা, তোমার নাম গোলকবানু হইল ক্যান?
-        জন্মের সময় আমার বদন খানি আছিল গোল। হেই লেইগ্যা তোর নানায় নাম রাখছিলো গোলক বানু।
নবা মায়ের কথায় হাসে। আবারো জানতে চায়
-        আমার নানা-নানী কই?
-        হেরা হেই-ই দক্ষিণে থাকতো। এহন মনে অয় নাই।
-        তুমি আর যাবা না?
-        তৌফিক নাইরে বাবা। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
ভূবন একদিন বলেছিল
-        গোলকী, তুমি বাপের বাড়ি যাবা না?
- কেমতে?
- ধর আমি যদি লইয়া যাই?
- না, তা অইবো না। তুমি গেলে তোমারে আস্তা রাখবে না।   আমি তোমার হারাইতে পার“মনা।
এরপর কখনোই গোলক বানুকে বাপের বাড়ি যাবার কথা বলেনি ভূবন। সে জানতো নিজের বাবা-মা বহু আগেই কলিকাতা চলে গেছে। অবশ্য সে কারণে কখনোই তার দীর্ঘশ্বাস বের হয় নি।
নবা একবার বাবার কাছে আবদার করেছিল কাউখালি যাবে। বাবা বলেছিল
- দেশ স্বাধীন হইলে যাবি।
স্বাধীন মানে কি জানতে চাইলে সে বলেছিল-
-        আমাগো মতন যহন পুরা দেশটা হইবো। বিদেশীরা আমাগো উপর মাতুব্বরী করতে পারবো না।
মুর্খ নবা বাবার কথার মানে বুঝতে পারে নাই। গোলকবানু কিন্তু ঠিকই বুঝেছিল। ভূবন তাকে কিছু না বললেও দেশের খোঁজ খবর রাখে। গোলক বানুর মনটা গর্বে এক হাত ফুলে যায়। ও হাসে, ভূবন এইট পর্যন্ত পড়েছিল।
অঘ্রাণ মাস। বিকেল বেলা থেকেই আকাশে মেঘ। পানি বাড়তি। ভূবন বা গোলক বানুকে এ নিয়ে ভাবতে দেখা যায় না। বাইশ তেইশ বছর ধরের ওরা এমনি দেখে আসছে। নবার মনে ভয় লাগে। অঘ্রাণ মাসে আকাশে মেঘ থাকবো ক্যান? জল বাড়লেও এতটা বাড়ার কথা না। রাত বাড়তেই পানিও বাড়তে থাকে। এবারে ভূবন আর গোলক বানুও ভয় পেয়ে যায়। মাচাং বানাতে ব্যস্ত্ হয়ে যায় ওরা, সময়ে কুলায় না। শেষে, ঘরের চালে আশ্রয় নেয় ওরা। গোলকীর চরে বড় কোন গাছ নেই। সেজন্য ওদের আফসোস ছিল না। ভূবন জানতো, বড় বড় গাছ হলেই সরকারি লোকের চোখে পড়বে। আর চর চলে যাবে সরকারের দখলে। আজ পানি বাড়ার গতি দেখে ভয়ে ভয়ে সে ভাবছে, বড় গাছ থাকলে ভাল হতো। তিনজনের একটা আশ্রয় হতো।
সারা রাত শংকায় কেটে গেলো। কোন মতে বেঁচে রইল ওরা। ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা জানায় ভূবন। গোলক বানু বহুদিন পর নামাজ পরে। নবা, সে আর কি করে, তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কখন মেঘ কেটে সূর্য উঠবে সেই আশায়।
এরপর থেকে ভূবন বিকল্প বাসস্থানের চিনন্তা ভাবনা করতে থাকে। গোলক বানু সায় দেয় না। তবে নবার জন্য মায়া ছাড়ে গোলক বানু। নবাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়ে মিয়ার হাটের একটা কাঠের গোলায়। ভূবনের আশা, নবা যেন ভাল থাকে। গোলক বানুর আশা, নবা কাজ করে অনেক টাকা জামিয়ে এই চরে বড় ঘর বানাবে। সরকার এই চর নিলেও যেন কিনে রাখতে পারে সে। তারপর-
তারপর নবার ঘরে আসবে সুন্দরী একটা বউ। সে হবে শ্বাশুরী, আরও পরে দাদি। ছোট সোনার সংসার আনন্দে হাসিতে ভরে রাখবে আরেক নবা।
একদিন গভীর রাতে নবা বাড়ি আসে। সাথে জনা চারেক বেটা ছেলে। মায়ের কাছে মিছা বলেনা নবা
-        মা দেশে যুদ্ধ শুরু হইছে। পীর সাহেব আমাগোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাছে। পাকিস্তানীরা বাঙালি মারতাছে।
গোলক বানুর মাথায় ঢোকে না কিছু। সে বুঝতে পারে না। পাকিস্তানতো একটা দেশ। তারাও তো এ দেশের লোক। নিজেরা নিজেগো মারবো ক্যান? তবে ছেলে যখন যুদ্ধ করছে, মায়ের মত যুদ্ধের পক্ষে। তাছাড়া বাবা খুশি হয় যে, স্বাধীনতার কথা কদিন আগেও নবা বুঝতো না, সেই ছেলেই এখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। সে প্রতিজ্ঞা করে যুদ্ধের পে তারা কাজ করবে।

গোলকীর চরে পৌঁছতেই চোখ দুটো ভরে গেল। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। বড় কোন গাছ নেই। সবুজ ঘাস আর মাঝে মধ্যে দু’এক গোছা বিচালি, মাঝি নৌকা বেঁধে রেখে আমায় সঙ্গে নিল। দু’জনে হাঁটছি। সে বলে যাচ্ছে......
-        যুদ্ধের সময় গোলক বানুর বাড়িতে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প হইছিলো। আমড়াঝুড়ির হাশেম চেয়ারম্যান খবরটা কাউখালী থানায় জানাইয়া দিছিল। রাজাকারের বাচ্চা আছিল বেডা।
-        তার মানে ওর বাবাও রাজাকার ছিল?
-        না ভাই সাব। হের বাবাতো আরো আগেই মরছিল। তয় রাজাকারগো রাজাকারের বাচ্চা কইতে ভালো লাগে।
-        তারপর?
-        খবর পাইয়া কাউখালী আর স্বরূপকাঠী থেইক্যা গানবোটে মিলিটারীরা আইলো, লগে বহুত রাজাকার। পুরা চরডা দখল কইরা ফালাইলো।
-        মুক্তি বাহিনীরা কোথায় ছিল?
-        হগলতেই চোরা ডুব দিয়া গাববাড়ির দিকে পালাইছিল। দিন ভর পুরো গোলকির চরে কাউরে পায় নি পাক আর্মি, কেবল গোলক বানুকে ছাড়া। হাশেম চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে ক্যাপ্টেন বুঝতে পারে পুরো চরটা গোলক বানুর। একাই মুক্তিদের ক্যাম্পটা সে চালাইতো। কিন্তু কোন মুক্তি ধরতে না পারায় ােভে গুলি করে হাশেম চেয়ারম্যানকে মেরে ফেলে মিলিটারীরা। মাঝির ভাষায়
-        কুত্তা হাশেমের লাশ মাস খানেক সন্ধ্যা নদীতে ভাসছিল। জোয়ার ভাটায় এই নদীতেই আওয়া-যাওয়া করছে। অন্য কোন হানে যায় নাই।
-        গোলক বানুর কি হলো?
-        কুত্তার বাচ্চারা গোলক বানুরে মাইরা একটা খুটি পুইতা ঝুলাইয়া রাখছিল।
কথাগুলো বলে মাঝি চোখ মুছলো।
-        তয় দেশ স্বাধীনের পর হগলে মিল্লা নবারে লইয়া হের মায়ের হাড্ডি গুলান ওই-ই হানে কবর দিছিল।
না, দেশ স্বাধীন হবার পর নেতা গোছের কেউ গোলকীর চরে আসে নি। কোন সৌধ নির্মিত হয় নি গোলক বানুর কবরে। তবে সার্ভে বিভাগ যখন এই চরটিকে তালিকাভুক্ত করে তখন সরকারের খাতায় এর নাম স্থায়ীভাবে হয়ে যায় গোলকীর চর।
কিভাবে হলো এই নামকরণ? মাঝির ভাষায়-
-        একদিন লাল নিশান উড়াইয়া একখান ইস্প্রিট বোট আইলো। সায়েবরা কি জানি কওয়া কওয়ি করলো। হেই সময় গোলক বানুর কবরের সামনে বওয়া আছিল হের স্বামী। আধ পাগলা তহন। সায়েবরা যখন জিগাইলো তোমার নাম কি? চরের নাম কি? তখন হের খালি একখান কথা
- গোলকীরে, তোর চর আইজ থেইক্কা সরকার লইয়া গেলরে।
কতাডা কইয়াই হেও মইরা গেল।
সূর্য ডুবো ডুবো। পাশাপাশি দু’টো সমাধি। কোন সৌধ নেই। শান্তিতে চির নিদ্রায় শায়িত গোলকবানু আর ভুবনেশ্বর। তাদের ছেলে নবা আর আসে না এ চরে।
নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে চোখের কোনায় জলের উপস্থিতি অনুভব করলাম। সেই সাথে শুনতে পেলাম তিব্র চিৎকার
-        গোলকীরে, তোর চর আইজ থেইক্কা সরকারে লইয়া গেলরে।