নুরুল্লাহ মাসুম
নবম পর্ব
নুরুল্লাহ মাসুম
নুরুল্লাহ মাসুম
চা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। সমতলের চা চাষের পথিকৃত জেলা
পঞ্চগড়। ২০০০ সালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষুদ্র পর্যায়ে সমতলের চা শিল্পের
যাত্রা শুরু হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সমতল ভূমিতে চা চাষ দেশের অর্থনৈতিক
উন্নয়নে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এক সময়ের পতিত গোচারণ ভূমি এখন সবুজ পাতায় ভরে
গেছে। পঞ্চগড়ের চা ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে চা চাষে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের
চা মানচিত্রে উত্তরাঞ্চলের সমতলের চা দেশের দ্বিতীয় চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে স্থান
করে নিয়েছে।
আমরা আনন্দ ধারার ভেতরটা ঘুরে-ফিরে দেখলাম বেশ সময় নিয়ে। এখানে পর্যটকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে, তবে তা বেশ ব্যয়বহুল এবং সাধারণ যোগাযোগ সহজসাধ্য নয় বলে এখানে সাধারণ পর্যটকদের আনাগোনা খুব কম। কেবল দেখার জন্যই এখানে পর্যটকরা এসে থাকেন। তবে কর্পোরেট লেভেলের যে কোন আয়োজনের জন্য স্থানটি চমৎকার।
পরের গন্তব্য পঞ্চগড়ের অন্যতম গড় ভিতরগড় এবং সেখানেই আরেকটি দর্শনীয় স্থান
মহারাজার দিঘী। সমতলের চা বাগান অতিক্রম করে প্রথমে চাইলি বা চাওয়াই নদী ও পরে শালমারা
খাল অতিক্রম করে এগিয়ে চললাম ভিতরগড়ের সন্ধানে। এর সন্ধান পেতে আমাদের অনেক কাঠ-খড়
পোড়াতে হয়েছে। যদিও জেনেছি, অবসরপ্রাপ্ত সচিব সুহেল
আহমেদ চৌধুরী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এন. এম. হাবিবুল্লাহ এবং শাহনাজ হুসনে জাহানের নেতৃত্বে
২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ভিতরগড় সংরক্ষণ সমিতি গঠিত হয়। সমিতি ভিতরগড় দুর্গ সম্পর্কে জনসচেতনতা
বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে এবং ভিতরগড়ে উৎখনন এবং উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শনের সংরক্ষণের
বিষয়েও এই সমিতি সক্রিয় রয়েছে। তবু স্থানীয় লোকজন এটির সন্ধান দিতে বারবার
ব্যর্থ হয়েছে।
ভিতরগড় পঞ্চগড় জেলার সদর
থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তরে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত মধ্যযুগের একটি দুর্গ
নগরী। আয়তন ২৫ বর্গ কিলোমিটার। ইঙ্গ-আইরিশ সরকারী কর্মকর্তা রবার্ট মন্টগোমারি মার্টিন
কর্তৃক লিখিত দ্য হিস্ট্ররী, এন্টিকুইটিস,
টপোগ্রাফি এণ্ড স্ট্যাটিসটিকস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া গ্রন্থটির ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে
প্রকাশিত ৩য় খণ্ডে সর্বপ্রথম ভিতরগড় দুর্গের উল্লেখ দেখা যায়। ভিতরগড় দূর্গের অভ্যন্তরে
২২ প্রত্নস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা যায়। দুর্গটি কয়েকটি স্তরে চারটি
আবেষ্টনী দেওয়াল দিয়ে বিভক্ত ছিলো এবং এর উত্তর দিকের দেওয়াল এবং পূর্ব-পশ্চিম দেওয়ালের
বেশীরভাগ অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় পড়েছে। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে বুকানন
হ্যামিল্টন ভিতরগড় পরিদর্শন শেষে লিখেছিলেন যে, “ভিতরগড় নগরীটি চারটি আভ্যন্তরীক
গড়ের সমবায়ে গঠিত। গড়গুলির একটি অপরটির অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত। রাজার প্রাসাদ অবস্থিত
ছিল সবচেয়ে ভিতরের গড়ে। সবচেয়ে ভিতরের এবং মধ্যবর্তী নগরীর উপবিভাগ ছিল। প্রতিটি
নগরী সুইচ্চ দুর্গপ্রাচীর ও সুবৃহৎ পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল যার প্রস্থ প্রায়
৫০ ফুট এবং গভীরতা ১০ থেকে ১৫ ফুট। দুর্গর প্রাচীর মাটি ও ইটের মিশ্রণে তৈরী ছিল। দুর্গ
নগরীটি কয়েকটি ক্ষুদ্র নগরীতে বিভক্ত ছিল। পূর্ববাহুর সবচেয়ে বাইরের নগরীতে নিম্নবর্গীয়
মানুষজন বসবাস করতো।” ধারণা
করা হয়, দুর্গটি নির্মাণ করেছেন কামরূপ রাজ্যের মহারাজা পৃথু। মতান্তরে মহারাজা
পৃথু ছিলেন জলপেশ্বর রাজ্যের রাজা এবং এটি ছিল তার রাজধানী। ১২০৬ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন
মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি এবং ১২২৬ সালে সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের সাথে তিনি যুদ্ধে
জয়লাভ করেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। কথিত আছে, মহারাজা পৃথু রাজা পরিবার-পরিজন
ও ধনরত্ন-সহ ‘কীচক’ নামক এক নিম্ন শ্রেণীর দ্বারা
আক্রমণের শিকার হয়ে তাদের সংস্পর্শে ধর্ম নাশের ভয়ে উক্ত দিঘীতে আত্মহনন করেন; এর কোন
সঠিক সময় ও তারিখ জানা যায় না। অনেক পরে ১২৫৭
সালে সুলতান মুঘিসউদ্দীন কামরূপ রাজ্য আক্রমণ করলে ভিতরগড় সুলতানী শাসনে চলে
যায়। ১৪৫৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভিতরগড় অঞ্চলটি কামরূপ রাজ্যের হোসেন শাহ শাসন
করেছেন। এছাড়াও এ অঞ্চলটি কোন এক একসময় গৌড় ও প্রাগজ্যোতিষপুরের অংশ
ছিলো বলে মনে করা হয়। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৬ আগস্ট ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক প্রত্নতত্ত্ববিদ
ড. শাহনাজ হুসনে জাহান লীনার তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েকবার খননকাজ পরিচালনা করাহয়। তবে বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং কোন
প্রকার কর্মযজ্ঞ দেখা গেল না। আমরা দেখতে পেলাম গড়ের পুরো এলাকাজুড়ে চা-বাগান করা হয়েছে।
এও দেখলাম, যত্রতত্র পুরাতন ইটের ছড়াছড়ি। সরকারি উদ্যোগে ইতিহাসের অস্তিত্ব সামনে আনা
সম্ভব বলে আমরা মনে করি। এতকরে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস যেমন সামনে চলে আসবে, তেমনি পর্যটনখাত
লাভবান হবে।
সপ্তম পর্ব
নুরুল্লাহ মাসুম
“তেতুলিয়া’’ আমাদের
দেশের সকলের নিকট এক নামে পরিচিত। জনশ্রুতি,
প্রাচীন কালে এ এলাকায় প্রচুর তেতুল গাছ ছিল। তেতুল গাছের ছায়ায় বসে পথিকেরা
বিশ্রাম নিত। এক সময়ে এখানে একজন বিশিষ্ট ইংরেজ বণিক বাস করত। তার বাবার নাম ছিল
টিটু এবং তার বাসগৃহ ছিল একটি উঁচু টিলার উপর। সেখানে একটি তেতুল গাছ ছিল।
কালক্রমে সেই ইংরেজ বণিকের বাবার নাম ‘টিটু’ থেকে ‘টেটু’ এবং “তেঁতুলতলা” হতে
‘‘লিয়া”; অপভ্রংশ হতে হতে জনপদের নামকরণ হয় “তেতুলিয়া”।
এখন আর তেতুল গাছের সমাহার নেই সেখানে, তবে তেতুলিয়া বাজারে এখনো প্রতীক হিসেবে
একটি বড় তেতুল গাছের দেখা মেলে। স্থানীয় এক ভ্যান চালকের ভাষ্য অনুসারে এমন শত শত
তেতুল গাছ ছিল শহরজুরে, সব গাছ কাটা হলেও এই একটি গাছ যত্ন করে রেখে দেয়া হয়েছে।
তার কথায়, তেতুল গাছ থেকেই তেতুলিয়ার নামকরণ হয়েছে। আমরা সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সেই
তেতুল গাছের কাছেই একটি রেস্টুরেন্টে সকালের নাশতা সেড়ে নিলাম।
ঠাকুরগাঁ থেকে পঞ্চগড় সদর হয়ে তেতুলিয়া পৌঁছতে প্রায় দুই ঘন্টা লাগার কথা থাকলেও, প্রথমত রাস্তা একেবারে ফাঁকা থাকায় এবং আমাদের চালক দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়ায় আমরা দেড় ঘন্টায় পৌঁছে যাই গন্তব্যে, অর্থাৎ তেতুলিয়া ডাক বাংলোয়- ঘড়িতে তখন সময় সকাল ৫টা ৩৭ মিনিট।
চলবে
দ্বিতীয় পর্ব
দুপুর ১২টায় আমাদের ভ্রমণ কার্যক্রম শুরু হয়। আমাদের পাইলট সবুজ হেলেনের শ্বশুর বাড়ি গাজীপুরের বাসিন্দা হলেও তার বসবাস ঠাকুরগাঁয়ে। সাবলিল গতিতে সে আমাদের দুই দিন সেবা দিয়েছে হাসিমুখে। পরিবর্তিত সূচি অনুসারে আমাদের প্রথম গন্তব্য মোহিনী তাজ। প্রায় চল্লিশ মিনিট চলার পরে আমরা পৌঁছলাম গন্তব্যে। পথে সকলেই উপভোগ করেছে হেমন্তের দুপুর ও অপরাহ্ণের বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য। গাড়ির ভেতরে থেকেই ছবি তোলা ও ভিডিও করা এবং মোহিনী তাজ সম্পর্কে মহিউদ্দীন ভাইয়ের বর্ণনা শুনতে শুনতে পথ-পরিক্রম শেষ হলো।
চিকিৎসক ফিরোজ জামান জুয়েল শুধু
একজন চিকিৎসকই নয়, তিনি কবি, স্থপতি, প্রকৌশলী, ডিজাইনারও বটে। তার স্ত্রী জেসমিন রহিমও একজন চিকিৎসক। নিজের স্বপ্ন, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, নারী জাতির প্রতি
শ্রদ্ধা ও স্ত্রীর প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসাকে উৎসাহ ও সাহস হিসেবে নিয়েই মোহিনী তাজ
নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। তার দৃষ্টিনন্দন মোহিনী তাজকে নিয়ে তিনি
লিখেছেন-
“গগনবিদারী ভুবন রাজ,
মাধবীকুঞ্জে মোহিনী তাজ।
শিল্পশৈলী কারুকাজ,
দিগ্বিজয়ী মোহিনী তাজ।”
ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল
উপজেলার উত্তর পাশে প্রায় ৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে নেকমরদ ইউনিয়ন। নেকমরদ বাজারের পাশেই পীরশাহ সৈয়দ
নাসিরউদ্দিন মাজার অবস্থিত। জানা যায় আগে এই এলাকার নাম ছিলো ভবানন্দপুর;
তারও আগে এলাকাটির নাম ছিল করবর্তন। পীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন অত্যন্ত পরহেজগার থাকায়
নেকমর্দান নামে পরিচিত ছিলেন যার অর্থ পূণ্যবান মহাপুরুষ। সুলতানি আমলে তার আগমন
ঘটে বলে অনুমান করা হয়। ১৯১২ সালে প্রকাশিত এফ. ডাব্লিউ, স্ট্রং রচিত ইস্টার্ন
বেঙ্গল গেজেটিয়ার- দিনাজপুর-এ প্রথম বারের মতো পীরশাহ নেকমরদ-এর নাম ও মাজারের নাম
উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সেখানে তার সম্পর্কে বিস্তারিত কোন বিবরণ তিনি দিতে পারেন
নি। নেকমরদ এলাকাটি প্রত্ন-উপকরণে সমৃদ্ধ। পীরশাহ নাসির উদ্দিন নেকমরদের মাজার
প্রত্ন উপকরণের মাঝে প্রতিষ্ঠিত বলে কিংবদন্তির কাহিনী আরো জোরালো। এফ. ডাব্লিউ,
স্ট্রং নেকমরদ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলতে পারলেও কিংবদন্তি বলছে, হিন্দু
রাজত্বের শেষ যুগে ভিমরাজ ও পিতরাজ নামে দুই ভাই এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তাদের
শাসনামলে প্রজা সাধারণ ছিল নির্যাতিত। অনাচার, দুর্নীতি আর অরাজকতায় মানুষ ছিল
কোণঠাসা। অতিষ্ট মানুষ ভয়ে কিছু বলতে পারতো না দুঃশাসক ভিমরাজ ও পিতরাজের
বিরুদ্ধে। এমন দুঃসময়ে শেখ নাসিরউদ্দিন নেকমরদের এ রাজ্যে প্রবেশ করেন। ভিমরাজ ও
পিতরাজ কৌশলে তাকে বাধা দিলে তিনি অলৌকিক ক্ষমতাবলে সে বাধা ছিন্ন করেন। বিরক্ত
হয়ে অত্যাচারি দুই ভাইকে অভিশাপ দিলে তারা ধংস হয়ে যায়। তাদের রাজধানীর ধ্বংসাবশের
উপর নির্মিত হয় পীরশাহ নেকমরদের আস্তানা। বিধ্বস্ত রাজধানীর উপর শুরু হয় নতুন
জনপদের যাত্রা। তার অলৌকিক ক্ষমতার অনেক কিংবদন্তি এলাকায় আজো প্রচলিত রয়েছ। তিনি
পহেলা বৈশাখে ইন্তেকাল করেন, তবে কবে আগমন ও পরলোকগমন করেন তার কোন প্রকৃত তথ্য
পাওয়া যায়নি। প্রতিবছর তার সম্মানে বৈশাখ মাসে ওরস উদযাপন ও মেলা চলে। নেকমরদ ওরস
মেলায় এক সময় এখানে হাতি, ঘোড়া, উট সহ প্রায় সব ধরনের জিনিস পত্র কেনা বেচা হতো
বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এখনও প্রতি বছর ডিসেম্বরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং এক মাস
স্থায়ী থাকে। পীরশাহ নাসিরউদ্দিনের মাজারটি প্রায় ৮৫ বছর আগে নির্মিত হয়। এটি আগে
কাঁচা থাকলেও বর্তমানে কারুকার্যে শোভা মন্ডিত করা হয়েছে। বর্তমানে নেকমরদ ইউনিয়ন
ও ওরশ মেলা ওই এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে চলেছে।
আমাদের পরের গন্তব্য রামরাই দিঘী।
রাণীশংকৈলে
প্রাচীন ঐতিহ্যের এক নিদর্শন রামরাই দিঘী। ঠাকুরগাঁও জেলার সবচেয়ে প্রাচীন ও
বৃহত্তম দিঘী । দিঘীর সঠিক কোনো ইতিহাস এখনো জানা যায় নি, কে বা কারা এটি খনন
করেছিল, কবে খনন করেছিল। তবে এলাকাবাসীর ধারণা দিঘীটি পাঁচশ থেকে হাজার বছরের
পুরাতন।একসময় এই দিঘী ছিল এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পানীয় জলের চাহিদা পূরণের
উৎস। এ দিঘীকে ঘিরে নানা লোককথা শোনা যায়। কোন এক সময়ে রামরাই দিঘীর নামকরণ করা
হয় রানি সাগর। এটি উপজেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দিঘীর চারপাশে
প্রায় ১২০০-এর অধিক লিচু গাছ-সহ অন্যান্য গাছ লাগানো হয়েছে। দিঘীর চারিদিকের
সবুজের বিশাল সমারোহ আর টলটলে জলরাশি মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
এছাড়া বিভিন্ন পাখির কুজন রামরাই-এর সৌন্দর্যকে আরো অধিক আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শীতের সময় হাজারো অতিথি পাখির দেখা মেলে এখানে। তাদের কিচির মিচির শব্দে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। অনেকেই এলাকাটিকে পাখিরাজ্য বলে আখ্যায়িত করে থাকে। পুকুরটি ১৮.৩৪ একর সুউচ্চ পাড় ও ২৩.৮২ একর জলভাগসহ মোট ৪২.২০ একর বিশিষ্ট। রামরাই দিঘীটি বরেন্দ্র ভূমিতে প্রাচীন জলাশয়গুলির মধ্যে আয়তনে দ্বিতীয় বৃহত্তম। পুকুরটির দৈর্ঘ্য উত্তর দক্ষিণে ৯০০ মিটার ও প্রস্থ পূর্ব-পশ্চিমে ৪০০ মিটার। আমরা এখানে প্রায় আধা ঘন্টা অবস্থান করি। দিঘীর পাড়েই হোসেনগাও ইউনিয়ন পরিষদের অফিস।
চলবে
নুরুল্লাহ মাসুম
পিতৃহারা পূর্ণিমা লালিত-পালিত হচ্ছিল তার একমাত্র ভাইয়ের সংসারে। ভাইটি তার থেকে বছর আটেকের বড়। পেশায় নৌকা-চালক, যাকে আমরা মাঝি বলে জানি। বিশাল দেহের অধিকারী বাহর আলী প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীতে খেয়া পাড়াপাড়ের কাজ করে। বাবার আমলের একটা মাঝারি গোছের নৌকা তার একমাত্র সম্বল। খুব সকালে এক-গামলা পান্তা খেয়ে প্রায় মাইল দেড়েক পাঁয়ে হেঁটে নৌকার কাছে যায় এবং কাজে লাগে। বাহর আলীর নৌকা যখন ঘাটে সক্রিয় হয়, তখন বাজারের মসজিদে মুয়াজ্জিন আজান দেয়। দিনভর কাজ শেষে এশার নামাজের অনেক পরে বাহর আলী ঘরে ফেরে।
বাবা মারা যাওয়ার বছর তিনেক আগে দুই বছরের বোন পূর্ণিমাকে রেখে মারা যায় বাহর আলীর মা। ছোট্ট বোনটাকে মানুষ করতে তার বাবাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। প্রথমদিকে বাহর আলীর ফুপু এসে বাড়িতে থাকতেন। এক বছর যেতে না যেতেই বাহর আলীর বাবা এস্কেন্দার আলীও পরপারে চলে গেলেন। ছোট্ট বোন পূর্ণিমাকে নিয়ে তখন বাহর আলীর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ফুপু আরো বছরখানেক ওদের সাথে ছিলেন, তারপর তিনিও অনন্তলোকে যাত্রা করলেন। ফুপুর কোন ছেলে-মেয়ে না থাকায় শ্বশুর বাড়িতে যতটকু জমি-জমা ও নগদ সম্পত্তি পেয়েছিলেন, তা বাহর আলীর হাতে তুলে দিয়ে যান। তবে ফুপু বাড়ির লোকদের তালবাহানায় জমি-জমার কোন ভাগই বাহর আলী পায়নি।
পূর্ণিমা বাহার আলীর সাথেই ঘুমাতো। দিনের বেলায় প্রতিবেশীরা তাকে দেখে রাখতো। বাহর আলী রাতে যা রান্না করতো, সেটাই ছিলো সকাল ও দুপুরে ওদের দুজনের খাদ্য। রাতে আবার রান্না। মাঝে মধ্যে এ-ঘর ও-ঘর থেকে কিছু খাবার জুটতো পূর্ণিমার ভাগ্যে। পূর্ণিমা খুশী হতো। ফুপু মারা যাওয়ার পর ওদের এক পাড়াতুত চাচি মূলত পূর্ণিমাকে দিনভর দেখে রাখতো।
একাকী বাহর আলী ছোট্ট বোনটাকে লালন-পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। পাড়া-প্রতিবেশীরা তখন মোক্ষম পরামর্শ দেয় ঘরে বউ আনার জন্য। বাস্তবে তাই ঘটে। বছর দুয়েক বাদে এক পৌষের শেষে বাহর আলীর ঘরে আসে নতুন বউ- দুটো গ্রাম বাদ দিয়ে কোন এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে নতুন বউটি। বিয়েতে কোন জাকজমক ছিলো না, থাকার কথাও নয়। তবু বাড়ির অন্যান্য গৃহস্তরা মিলে যা আয়োজন করে, তাতেই নতুন বউ তাহেরা বানু খুশী হয়; খুশী হয় বাহর আলীও।
৫ বছর বয়স থেকেই পূর্ণিমার একাকী থাকার অভ্যাস হয়ে যায়। আরো বছর দুয়েক বাদে বাহর আলী ও তাহেরার ঘর আলো করে আসে একটি ছেলে- নাম রাখা হয় মজিবর। দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ণিমা ছোট থাকায় একপ্রকার নিশ্চিন্তে দিন কাটে বাহর আলীর। অন্যান্য ঘরের সোমত্ত মেয়েদর নিয়ে প্রতিটি পরিবার ছিল দুশ্চিন্তগ্রস্ত। কেউবা তাদের পাঠিয়ে দিয়েছিল দূর গাঁয়ের কোন নিকট বা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে। সে সময়টাতে সকলে নানান ভাবনায় থাকলেও পূর্ণিমা দিন কাটিয়েছে হেসে-খেলে।
মজিবরকে নিয়ে ফুপু পূর্ণমার দিন কাটে বেশ। হেসে-খেলে দিন বয়ে যায়। দিন যত গড়ায় বিপদ তত সামনে এসে দাঁড়ায়। পূর্ণিমা দিনে দিনে গায়ে-গতরে ধাই-ধাই করে বেড়ে চলেছে। গায়ের রঙ ঠিক পূর্ণিমার চাঁদের মতই। ওর বাব-মায়ের দেয়া নামটা সার্থক হতে থাকে দিনে দিনে।
বন্যায় পুরো দেশ ডুবে আছে। সদ্য স্বাদীন দেশে তখন দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। গ্রাম ছেড়ে সকলেই ছুটছে ছোট-বড় শহরের দিকে। কেউবা চালনা বন্দরে কাজের সন্ধানে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বেড়ে চলেছে। বাড়ে না কেবল বাহর আলীর নৌকা পারাপারের তোলা। যুদ্ধের আগে থেকে চলে আসা দুই পয়সাতেই তাকে যাত্রী পারাপার করতে হয় দেড় মাইল চওড়া সন্ধ্যা নদী। সে যেমন-তেমন কাজ নয়। মাঘের শেষ থেকে শুরু করে শ্রাবণের শেষাবধী সন্ধ্যার যে প্রমত্তা রূপ, যে না দেখেছে তাকে বিশ্বাস করানো যাবে না। কঠোর হাতে বৈঠা ধরে অনায়াসে বাহর আলী পাড়ি দেয় সেই নদী। এলাকায় তার একটা নাম-ডাক রয়েছে দক্ষ মাঝি হিসেবে। নাম-ডাক যতই থাকুক, দিন শেষে ইজারাদারের পয়সা দিয়ে বাহর আলী যা হাতে পায়, তাতে সংসার চালানো কষ্ট হয়ে ওঠে।
অনিন্দ্য সুন্দর রূপের কারণে গ্রাম ছাপিয়ে গ্রামান্তরে পৌঁছে যায় পূর্ণিমার নাম। পূর্ণিমা এখন আর কেরানী বাড়ির পুকুরে গোছল করতে যেতে সাহস পায় না, ওর ভাবী ও চাচীরা ওকে একা যেতে দেয় না পুকুর ঘাটে। এলাকার বখাটেদের নজরে পড়ে পূর্ণিমা। অগত্যা সাব্যস্ত হয়, তাহেরা বিবি কেরানী বাড়ির পুকুর থেকে পানি এনে দেবে কলসী ভরে। হয়ও তাই। ঘরের পেছনে কলা-পাতার দেয়া ঘেরাটোপের মাঝে সেই এক কলস পানিতেই চলে পূর্ণিমার গোছল পর্ব। এ নিয়ে তার কষ্টের সীমা নেই। গ্রামের মেয়ে পুকুরে ডুবাবে, সাঁতার কাটবে- সে আর হয়ে ওঠে না। গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে দিনাতিপাত করে সে।
গ্রামের সকলের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। প্রতি রাতেই কোন না কোন বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটছে। দেশান্তরী হওয়ার কারণে প্রতিবেশী অনেক বাড়িতেই এখন মানুষজন কম, কোন কোন বাড়ি তো একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। বাজারে চালের আকাল। এখন বাহর আলীসহ অনেকেই দিনে দুবেলা আটার রুটি খায়। গলা দিয়ে কি নামে সেই রুটি? এরই মধ্যে আটার সাথে ধানের কুড়ো মেশানো পাওয়া গেছে। এ নিয়ে পঞ্চায়েতে নালিশ হলে বিচার-আচারের ঘটনাও ঘটেছে। রক্ষী বাহিনী আর লাল বাহিনীও মাঠে নেমেছ এসব কর্মকান্ড সামাল দিতে।
পূর্ণিমা আর অমাবশ্যার পালাবদলে আমাদের আলোচ্য পূর্ণিমা আরো বড় হতে থাকে। মনের কষ্ট আর খাবারের অনটন তার গতরের শ্রীবৃদ্ধিতে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। পূর্ণিমাকে এখন আর বাড়ির বাইরে ধারে-কাছের কোন খোলা যায়গায় দেখা যায় না। তবে দুষ্টু ছেলেরা ওৎ পেতে থাকে কখন সে কলাপতার ঘেরাটোপে গোছল করে আজানু লম্বা চুল শুকানোর জন্য বাড়ি উঠানের পশ্চিম কোনায় এসে বসবে, একটা জলচৌকি পেতে। বলাই বাহুল্য, বাহর আলীর অভাবের সংসারে পূর্ণিমার ভাগ্যে কোনকালেই চুলে দেবার মতো সুগন্ধি তেল জোটেনি। তবু, সে কি সুন্দর ঘন ও দীর্ঘ-কালোকেশী সেই পূর্ণিমা। এটা শুকানোর জন্য সে প্রতিদিন বাধ্য হয়েই উঠানের পশ্চিম কোনায় জলচৌকিতে বসতে হতো। পূর্ণিমা কেরানী বাড়ির মেয়েদর মুখে শুনেছে- চুল শুকানোর জন্য না কি কি এটা যন্ত্র আছে! ব্যবহার করবে কি, কোন কালে চোখেই দেখেনি সে। শুধু পূর্ণিমা কেন, কেরানী বাড়ির সকলেই কি তা দেখেছে? ওরা যখন বড় বোন হালিমার শ্বশুর বাড়ি চানপুর যায়, সেখানে দেখেছে কয়েকজনে। শহর বলে কথা। পূর্ণিমা শহর তো দূরের কথা, সন্ধ্যা নদীর পার হয়ে ওপাড়ে যায়নি কোনকালে। যাবার মতো ভাগ্য কি তার হবে কখনো? শুনেছে, ওপাড়ে বায়োস্কোপ আছে। বড় একটা লম্বা ঘরের ভেতরে আলো নিভিয়ে দিয়ে বই দেখায়- কি সুন্দর সুন্দর কাহিনী। শুদ্ধ ভাষায় না কি বলে সিনেমা হল, দেখায় সিনেমা।
কচু-ঘেচু গাডি (ওল কচু) আর কচুর বই (লতি) দিয়ে যখন ওদের দিন কোন রকমে কেটে যাচ্ছিল, তখন পূর্ণিমার বিয়ের প্রস্তাব আসে পাশের গ্রামের মাঝি-বাড়ির বড় ছেলের জন্য। ছেলেটির নামও মজিবর। মাঝি বাড়ি ছেলে হলেও সদরে একটা কলেজের দপ্তরী সে। মাসে মাসে মায়না পায় পঁচিশ টাকা। বাহর আলী রাজী হয়ে যায়। আদরের বোনটার যেমন একটা গতি হবে, তেমনি তার নিজের দায়িত্বও কমবে। তছাড়া ওদের বাড়িতে চাকরী করা কোন ছেলে নেই, তাই জানে না, চাকরি করা ছেলেরা কেমন হয়। গায়ে-গতরে কতটা শক্তিশালী হয়! তবে এটুকু জেনেছ- ওদের বাড়িতে খাওয়ার কষ্ট নেই।
বাহর আলী চেষ্টা করে বোনটার বিয়েতে সাধ্যমত ধুমধাম করার। জনা বিশেক লোক দাওয়াত করে খাইয়েছে। জামাইকে একটা কেমি ঘড়ি দিয়েছ। কথা দিয়েছে একটা সাইকেল দেবে- যাতে তার কলেজে যেতে সুবিধা হয়। এজন্য তার জমানো সবগুলো টাকা খরচ হবে জেনে তার বউ বাধা দিয়েছিলো, বাহার আলী শোনেনি। একটা বোন, কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে; তার জন্য খরচ করবে না তো কার জন্য করবে!
এখন আর গ্রামের ছেলেরা কেরানী বাড়ির পুকুরের আড়ালে থেকে পূর্ণমার অনিন্দ্য সুন্দর কালো-দীর্ঘ কেশ দেখার জন্য আড্ডা জমায় না লুকিয়ে। বহু বছর হয়ে গেছে পূর্ণিমাও ভাইয়ের বাড়িতে আসে না। সকলে ভাবে, পূর্ণিমা তার নিজের সংসারে ভালই আছে।
কুড়ি বছর হয়ে গেল, পূর্ণিমার কোন খবর জানে না গ্রামের লোকজন। কেমন আছে সে? পূর্ণিমার কোলে কি তার থেকে ফুটফুটে সুন্দর সন্তান এসেছে? সে কি নিজের সুখে ভাইয়ে কথা, ভাবীর কথা, প্রতিবেশীদের কথা এমন কি তার ভাইয়ে ছেলে মজিবরের কথা ভুলে সুখের সংসার করছে?
প্রতি বছর চৈত্র-সংক্রান্তির মেলায় গ্রামে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে ফাতু, সুরিয়া, মম, ফজিলা, নার্গিস, হাসি; সকলেই খেলার সাথী। এ সময়টাতে গ্রামজুড়ে যেন মেয়েদের মেলা বসে। এ বাড়ি ও-বাড়ি পড়ন্ত বিকেলে ওদের আড্ডা হয়, নিজ সংসারের গল্প, ছোটকালের গল্প- যেন স্মৃতি হাতড়ানোর প্রতিযোগিতা! সকলেই স্বামী সন্তানসহ এ সময়টাতে বেড়াতে আসে। কেবল পূর্ণিমার আর দেখা মেলে না চৈত্র-সংক্রান্তির মেলাতেও।
১৫ ২১১৭ আগস্ট ২০২৩
ইস্টার্ন প্লাজা, হাতিরপুল, ঢাকা।